kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কুড়িগ্রাম

সামিউল হক

রাজপথে ছিলেন। পুলিশের পিটুনি খেয়েছিলেন। দেশদ্রোহীর তালিকায় তাঁর নাম ওঠানো হয়েছিল। কারণ সামিউল হক ভাষার জন্য লড়াই করেছেন। আব্দুল খালেক ফারুক সম্প্রতি দেখা করে এসেছেন

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সামিউল হক

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সমগ্র পূর্ব বাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ধর্মঘট আহ্বান করে। কুড়িগ্রামের ছাত্রসমাজ ধর্মঘটকে সফল করার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কুড়িগ্রাম হাই স্কুলের ছাত্র আমান উল্লাহ (অ্যাডভোকেট আমান উল্লাহ নামে পরিচিত), এ জেড এম আসাদ (অ্যাডভোকেট এ জেড এম আসাদ নামেই পরিচিত), আলী আফসার, আবুল ফজল, আফজাল হোসেন ও মোস্তফা বিন খন্দকার ছিলেন নেতৃত্বে। ওই দিন কুড়িগ্রাম মহকুমা শহরের কুড়িগ্রাম হাই স্কুল, কুড়িগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম জুুনিয়র হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা মিছিলে অংশ নেন।

 

ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ

বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কুড়িগ্রামে ছাত্র ধর্মঘট, মিছিল ও সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতার মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। ওই দিন রাতেই স্থানীয়ভাবে গঠিত ভাষাসংগ্রাম পরিষদের গোপন বৈঠক হাবিবুর রহমান খোকার বাসায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোস্তফা বিন খন্দকার সভাপতিত্ব করেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন রেজা হোসেন খন্দকার, হাবিবুর রহমান, আব্দুল জলিল, আব্দুর নুর, আলী আসাদ, আয়নুল হক, যমেত আলী, এ টি এম আফজাল, বাদল রুদ্রসহ আরো কয়েকজন। ওই সভা থেকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। শহরে ঢোল পিটিয়ে প্রচারও করা হয়। স্কুলের শিক্ষার্থীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে নগ্ন পদে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিল। কুড়িগ্রাম জুনিয়র হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সামিউল হক নান্টুও অংশ নিয়েছিলেন মিছিলে। সেদিনটির কথা বলছিলেন, ছাত্র-জনতার মিছিলটি জাহাজ কম্পানি মোড় পার হয়ে মুসলিম লীগ নেতা পনির উদ্দিনের বাড়ির সামনে এলে তিনি মিছিলকারীদের দিকে তেড়ে এসে বলেন, ‘পাকিস্তান পাইছ, তোমরা সেটাকে ধ্বংস করতে চাও? আমরা মুসলমান, আমাদের ভাষা হবে উর্দু।’ তাঁকে জুতা খুলতে বললে তিনি অকথ্য গালাগাল করে পুলিশকে মিছিল ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ মিছিলে হামলা চালিয়ে বাদল রুদ্রকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ মিছিলে লাঠিপেটা করে এবং মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে কুড়িগ্রাম ১ নম্বর মাঠের স্কুলে মিলাদ মাহফিল ও আলোচনাসভা আহ্বান করা হলে সেখানেও পুলিশ বাধা দেয়।

 

শহীদ মিনার

তবে তখন পর্যন্ত কোনো শহীদ মিনার ছিল না কুড়িগ্রামে। ১৯৫৩ সালে শহীদ দিবসের আগের দিন অ্যাডভোকেট আমান উল্লাহ, সাংবাদিক তোফায়েল হোসেন, সামিউল হক নান্টু, আব্দুল আহাদ, আব্দুল হামিদ, হিমাংশু রায়, বুদ্ধদেব সরখেল, জয়ন্ত রুদ্র, অ্যাডভোকেট আসাদসহ কয়েকজন মিলে কুড়িগ্রাম গওহর পার্ক মাঠে (এখন মজিদা আদর্শ মহাবিদ্যালয় মাঠ) একটি শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ব্যবসায়ী আনছার মিয়া ও মকবুল হোসেনের কাছ থেকে ইট চেয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়; কিন্তু রাতের আঁধারে পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙে দেয়। তবে উদ্যোক্তারা রাতে পাহারায় থেকে শহীদ মিনারটি আবার নির্মাণ করেন। পরদিন ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় কুড়িগ্রামের প্রথম শহীদ মিনার। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার শত শত মানুষ শ্রদ্ধা জানায় শহীদ মিনারে। 

 

হলেন দেশদ্রোহী

কুড়িগ্রামের দ্বিতীয় শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালে, কুড়িগ্রাম জুনিয়র হাই স্কুল (পরে নাম হয় রিভারভিউ হাই স্কুল) মাঠে। ওই স্কুলেই ১৯৬১ সালে সহকারী শিক্ষকের চাকরি নিয়েছিলেন সামিউল হক নান্টু। স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে সামিউল হকও উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন। শহীদ মিনার নির্মাণের সূত্র ধরে তাই পুলিশের ডিফেন্স পাকিস্তান রিপোর্টে তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর চাকরির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। সামিউল হক ছিলেন স্কাউটের শিক্ষক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ স্কাউটের চাকরিতে যোগ দেন। চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকা বিভাগে আঞ্চলিক স্কাউট ফিল্ড কমিশনার পদে চাকরি করেন। পরে স্কাউটের ঢাকা অফিসে পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। ২০০২ সালে তিনি এই পদে থেকে অবসর নেন। স্কাউটিংয়ে অসাধারণ অবদানের জন্য সর্বোচ্চ পদক সিলভার টাইগার পদক পান। স্কাউটিং ছাড়াও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৬১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ছিলেন।

 

এখন যেমন আছেন

কুড়িগ্রাম শহরের সবুজপাড়ায় বাস করেন সামিউল হক। তিনি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও টিআইবির উদ্যোগে গঠিত সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য। তিনি প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতিও ছিলেন। কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে সাংবাদিকদের বিপদে-আপদে পাশে থাকেন। তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষা প্রসারের জন্য ব্যাপক প্রচারণা দরকার। সাইনবোর্ডে এখনো ইংরেজির ব্যাপক ব্যবহার আমাকে পীড়িত করে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা