kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কুমিল্লা

আলী তাহের মজুমদার

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা হয়ে মুক্তিযুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছেন। দেশকে আলী তাহের মজুমদার ভালোবাসেন। তবে সব ছাপিয়ে ভাষাসৈনিক হিসেবেই বেশি পরিচিতি তাঁর। আবুল কাশেম হৃদয় শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আলী তাহের মজুমদার

বয়স এক শর বেশি। গায়ে খদ্দরের পায়জামা-পাঞ্জাবি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। তাঁর এক হাতে ছড়ি, আরেক হাতে থাকে বাজারের থলে। কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড়ের মানুষ প্রতিদিনই তাঁকে হেঁটে যেতে দেখেন। আলী তাহের মজুমদারের জন্ম ১৯১৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি (সনদ অনুযায়ী)। বাবার নাম চারু মজুমদার, মা সাবানী বিবি।

 

যেমন আছেন

সংসারে অভাব। ফেব্রুয়ারি মাসে লোকে যা কিছু খোঁজখবর করে। আর বছরের বাকি সময় কোনোভাবে কেটে যায়। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান কান্দিরপাড়ে পরিচিত এক হোমিও ওষুধের দোকানে। থাকেন কুমিল্লার দুর্গাপুর ভূমি অফিসের কাছে। নাতনি নাজমা আক্তারের বাড়িতে। তাঁর দুই স্ত্রী আকলিমা আক্তার ও সূর্যবান বিবি অনেক আগেই মারা গেছেন।

কষ্টের কথা কাউকে বলতে চান না। তবে না বললেও হয় না। বললেন, ‘আমার তেমন জায়গাজমি নেই; জমানো টাকাও নেই। একটা নাতি আছে, বেকার। দীর্ঘদিন অনেকের কাছে বলেকয়েও কাজের ব্যবস্থা হয়নি। তার একটা চাকরি দরকার। এভাবে চলতে কষ্ট হয়।’

আরো বললেন, ‘সারাটা জীবন রাজনীতি করলাম। কংগ্রেস করলাম, আওয়ামী লীগ করলাম। নেতাজি সুভাষ বসুর সঙ্গে চললাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চললাম।  এতজনের সঙ্গে চলে আসার পরও এখন আর কেউ খবর নেয় না। দুঃখ হয়। শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলে সবাই ডাকে। এরপর আর খবর নেই।’

 

সেসব সংগ্রামী দিন

চাঁদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর কুমিল্লা জিলা স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন আলী তাহের মজুমদার। ছাত্রাবস্থায় ১৯৩৫ সালে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অষ্টম পাঞ্জাব আর্মিতে যোগ দিলেও সাত-আট মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ছুটিতে এসে আর ফিরে যাননি। তখন তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তাঁকে বাঁচাতে কুমিল্লার তখনকার জেলা প্রশাসক আবদুল মজিদ ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের মোজাফ্ফর হোসেন ভূইয়া ফেনীতে জাপানি বাহিনীর বোমায় আলী তাহের মজুমদার নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেন। ওই সময়ে নেতাজি সুভাষ বসুর গুপ্তচর হিসেবে কাজ শুরু করেন আলী তাহের মজুমদার। কুমিল্লা ও ফেনীতে বিলি করেন সুভাষ বসুর লিফলেট।

দেশ ভাগের আগে আগে ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলে কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী কমিটি গঠন করেন। ১৯৪৬ সালের এক দিন কলকাতার এক চা দোকানে আড্ডা দেওয়ার সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় আলী তাহের মজুমদারের। তাঁর মুখেই আলী তাহের জানতে পারেন বাংলা ভাষাভাষী এলাকা নিয়ে বাংলাদেশ করার কথা।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বোসের পরিকল্পিত বাংলা ভাষাভাষী এলাকা নিয়ে স্বাধীন সরকার গঠনের জন্য কাজও করেছেন আলী তাহের। দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলেন কুমিল্লার গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। তখন ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

আলী তাহের মজুমদার তখন আরএসপি (রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি) করতেন। ওই অফিসে বসে ভাষা আন্দোলনের লিফলেট-পোস্টার লিখে বিলি করতেন। কুমিল্লা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও বিপ্লবী অতিন্দ্র মোহন রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চালাতেন আন্দোলন। বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলি হলে তা অতীন রায়ের মাধ্যমে জানতে পারেন। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কুমিল্লার মানুষ। আলী তাহের মজুমদার মিছিল করার সময় কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জে গ্রেপ্তার হন। পরদিন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগেও দুই দফা গ্রেপ্তার হয়েছেন আলী তাহের মজুমদার।

 

দেশে ফিরলেন

১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু কুমিল্লায় আরএসপি (রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি) দলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় আলী তাহের মজুমদারকে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর কথায় মুগ্ধ হন আলী তাহের। যোগ দেন আওয়ামী মুসলিম লীগে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন। ১৯৫৬ সালে কারামুক্ত হয়ে কুমিল্লা সদর থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের মার্চে চলে যান ভারতে, অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। রাজনীতি করেই জীবন কেটেছে তাঁর। কষ্ট শুধু সংসারে অভাব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা