kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বরিশাল

ইউসুফ কালু

সেদিনের টগবগে তরুণ বি এম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. ইউসুফ কালুর চোখে আজও ভাসছে আন্দোলন দিনের সেই সব দৃশ্য। রফিকুল ইসলাম শুনে এসেছেন দিনগুলোর কথা

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইউসুফ কালু

২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের কথা সন্ধ্যার পর বরিশালের নেতারা জানতে পারেন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে লঞ্চ ও স্টিমারে ঢাকা থেকে ভাষাসংগ্রামে জড়িত অনেক নেতা বরিশালে আসেন। তাঁদের কয়েকজনের হাতে ছিল ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকার ‘টেলিগ্রাম সংস্করণ’। ছাত্রদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে আসেন বাউফলের সৈয়দ আশরাফ হোসেন। ঘটনার বৃত্তান্ত শুনে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বরিশালের সর্বস্তরের মানুষ।

ওই দিন (২২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় অশ্বিনী কুমার হলের সামনে এ কে আজাহার উদ্দিনের সভাপতিত্বে ভাষাশহীদদের স্মরণে শোকসভা হয়। সভার পরে বিক্ষোভ মিছিলে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়। সেদিন সবাইকে অবাক করে বিপুলসংখ্যক নারী যোগ দেন বিক্ষোভ মিছিলে।

ইউসুফ কালু বি এম কলেজ শাখা ভাষাসংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বৃহত্তর বরিশাল ভাষাসংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন।

 

আটচল্লিশের কথা

১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য আন্দোলন শুরু হয়। ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে বি এম কলেজ ছাত্রদের উদ্যোগে একটি মিছিল শীতলাখোলা হয়ে বি এম স্কুল ধরে সদর রোডের দিকে যাচ্ছিল। ইউসুফ কালু তখন বি এম স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। তাঁর নেতৃত্বে কয়েক শ ছাত্র ওই মিছিলে যোগ দেন। পরে বরিশাল মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ছদরুদ্দীনের সভাপতিত্বে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে একটি মিছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে স্লোগান দিতে দিতে শহর প্রদক্ষিণ করে।

বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ওই দিন বিকেলে অশ্বিনী কুমার হলের সামনে হাশেম আলী খানের সভাপতিত্বে আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। ঢাকার সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ওই দিন বরিশালের স্কুল-কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। বরিশাল মুসলিম ছাত্রলীগ ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।

ইউসুফ কালু বলছিলেন, ‘১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের হরতালের পর সভা করার জন্য কোনো জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত শহরের ফকিরবাড়ী মুখে অভিরুচি সিনেমা হলের সামনে এবং আর্যলক্ষ্মী ভবনসংলগ্ন কচুক্ষেতের ভেতর সভার আয়োজন করা হয়। কাজী বাহাউদ্দীন আহম্মেদের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন ভাষাসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শামসুল হক চৌধুরী, এ বি এম আবদুল লতিফ, মোহাম্মদ মোর্শেদ, মোখলেসুর রহমান প্রমুখ। ওই দিন সন্ধ্যার পর পুলিশ তাঁদের আটক করে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা মিলে কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ আটককৃতদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। মুক্ত ভাষাসৈনিকদের নিয়ে থানা চত্বর অতিক্রম করেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে স্লোগান দিতে দিতে একটি মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে।

 

বরিশালের বায়ান্ন

বায়ান্নর ১৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল মালেক খানকে সভাপতি ও যুবলীগের সম্পাদক আবুল হাশেমকে আহ্বায়ক করে ২৫ সদস্যের বরিশাল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। বরিশালের ভাষা আন্দোলনে বি এম কলেজের ছাত্ররা ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। তাঁরা পৃথকভাবে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। এর আহ্বায়ক ছিলেন বি এম কলেজ শাখা মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি এবং বি এম কলেজ ছাত্রসংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া। বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর বরিশালের সব স্কুল-কলেজে ধর্মঘট ও শহরে হরতাল পালিত হয়। মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে আন্দোলনকারী জনতা। সেই দিন বরিশাল মিছিলের শহরে পরিণত হয়।

ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর জানার পর রাত ৯টায় শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়। পরে মুসলিম ইনস্টিটিউটে বৈঠকে বসেন নেতারা। সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসংখ্যা ২৫ থেকে ৮১ জনে উন্নীত করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা থেকে স্টিমারে আসেন সৈয়দ শামসুল হুদা। তিনি একটি পত্রিকার (সৈনিক বা আজাদ) ‘টেলিগ্রাম সংস্করণ’ নিয়ে আসেন, তাতে ঢাকায় ছাত্রহত্যার সংবাদ ছিল।

অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে ভোর থেকে ছাত্র-জনতার ঢল নামে। গ্রাম থেকে আসা জনতা ছাড়াও শহরের শত শত নারী মিসেস হামিদ উদ্দিনের (সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য) নেতৃত্বে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মিছিল বের করে। মিছিলটি বি এম কলেজ থেকে আসা অপর একটি মিছিলের সঙ্গে বরিশাল কলেজের মুখে একত্র হয়। পরে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গের চেষ্টা করে। একই সময় প্রায় ৫০০ ছাত্রের একটি মিছিল বেরিয়ে পড়ে বরিশাল এ কে স্কুল থেকে। পুরো মিছিলের অগ্রভাগে ছিল শত শত নারী; তাঁদের পেছনে সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। ছাত্র-জনতা শহর প্রদক্ষিণ করে অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে সমবেত হয়। সেখানে এ কে এম আজাহার উদ্দিনের সভাপতিত্বে শহীদদের স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় এ কে স্কুল মাঠে শহীদ ছাত্রদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরের দিন ২৪ ফেব্রুয়ারি অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে প্রথম শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরের দিন সেই শহীদ মিনার ভেঙে ফেলা হয়। আবার একই চত্বরে শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। শহীদ মিনারে একই সঙ্গে শোকের প্রতীক কালো পতাকা এবং সংগ্রামের প্রতীক লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়।

 

ইউসুফ কালুর একাত্তর

একাত্তরের ২৫ এপ্রিল ভোর থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী বরিশালে আক্রমণ শুরু করে। তখন আমির হোসেন আমু, খগেন্দ্র নাথ সাহা, রেজাউল মালেক খান আর ইউসুফ কালু আত্মরক্ষার্থে একটি জিপে করে ঝালকাঠির দিকে যাচ্ছিলেন। কালিজিরা পৌঁছা মাত্রই তাঁদের জিপ লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা করে। তাঁরা জিপ থেকে নেমে জঙ্গলের ভেতর আশ্রয় নেন। বিকেলের দিকে হামলা বন্ধ হলে সুগন্ধা নদী দিয়ে তাঁরা শেখেরহাট যান। আওয়ামী লীগের সভাপতি মালেক খান ওই এলাকার জুনুহারে অবস্থান করছিলেন। তাঁর দেওয়া নৌকায় করে ছোট খাল দিয়ে স্বরূপকাঠী হয়ে হুলারহাট পৌঁছান।

সেখান থেকে পিরোজপুরের পাড়েরহাটে গিয়ে দালাল ধরে ভারতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। বিনিময়ে ৮০০ টাকায় পাড়েরহাটের ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন ও সয়জুদ্দিনের সঙ্গে চুক্তিও হয়। সে অনুযায়ী মালবোঝাই একটি বড় নৌকায় করে আমির হোসেন আমু, খগেন্দ্র নাথ সাহা আর ইউসুফ কালু ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। নৌকাটি বলেশ্বর নদ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রচণ্ড ঢেউয়ের কবলে পড়ে। পরে তাঁরা স্বরূপকাঠী-বানারীপাড়ার ভেতরের ছোট খাল দিয়ে নৌকায় করে মধুমতি নদী ধরে বাগেরহাটে পৌঁছান।

একপর্যায়ে সীমান্ত পার হয়ে যান ভারতের হিঙ্গলগঞ্জ। তারপর শ্যামবাজারের বাংলাদেশ মিশনে অবস্থান করেন। বাংলাদেশ সহায়ক সমিতিতেও তাঁরা বেশ কিছুদিন ছিলেন। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরা আর তেভাটার বেশ কয়েকটি যুদ্ধে কালু অংশ নেন। কয়েকবার শত্রুর আঘাতে আহতও হয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি জন্ডিসে আক্রান্ত হন। হাসপাতালে প্রায় এক মাস চিকিৎসা শেষে ২২ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন।

 

ইউসুফ কালুর দুঃখ

ইউসুফ কালু বললেন, ‘আজও ভাষাশহীদদের নামে বরিশালের কোনো প্রধান সড়কের নাম রাখা হয়নি। আমি শহীদ মিনারে যাই না। যাওয়া মানে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। যে জন্য শহীদরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই সংগ্রামী চেতনা আমি, আমরা কি এখনো সমুন্নত রাখতে পেরেছি?’ উল্লেখ্য, ইউসুফ কালুর জন্ম ১৯৩২ সালে। তাঁর এক ছেলে। বরিশাল শহরের কবি জীবনানন্দ সড়কে (বগুড়া রোডে) তাঁর বাড়ি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা