kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জলের জীবন

চিলমারীর মাঝি

ব্রহ্মপুত্রে আনোয়ার মাঝির ২২ বছর হয়ে গেল। যাত্রী পারাপার তাঁর কাজ। দিনকয় আগে পিন্টু রঞ্জন অর্ক তাঁর নাওয়ের ছইয়ের ওপর বসে গল্প করে এসেছেন

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চিলমারীর মাঝি

চিলমারীর রমনা ঘাট। যাব অষ্টমীর চর ইউনিয়নের চরমুদাফত গ্রামে। কাঠের নৌকাটি ইঞ্জিনচালিত। মোট ১৫-১৬ জন যাত্রী। রমনা ঘাট ছাড়ার পরপরই ছইয়ের ওপর উঠে বসলাম। প্রাকৃতিক দৃশ্যে মন রাঙিয়ে উঠছিল। কিছুক্ষণ পর দেখি মাঝিও ছইয়ের ওপর। সহকারীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছেন। হঠাৎ করে মুরব্বিগোছের একজন জিজ্ঞেস করলেন—‘কি মাঝি, বিয়া করছ?’

—হুম।

—‘বউ পেটাও?’

 মাঝি হেসে ফেললেন।  বললেন, ‘না, বউ পিটামু ক্যান? পিটাইলে বউয়ে আদর করব?’

 মাঝির বয়স ৩০ হবে। পরনে চেকের লুঙ্গি। গায়ে একটা পলোশার্টের ওপর নীলরঙা আরেকটি ফুলহাতা শার্ট। বুকের বোতাম খোলা। কোমরে চাদর বাঁধা। আমি কাছে এগিয়ে গেলাম। আগের সূত্র ধরেই প্রশ্নটা করলাম, ‘কবে বিয়া করেছেন?’ এবারও হাসলেন। একটু আগেই পান খেয়েছেন। জিব তখনো লাল।

বললেন, ‘আমাগো এলাকায় অল্প বয়সে বিয়া হয়া যায়। ১৮ বছরে বিয়া করছি। তহনো এত কিছু বুঝবার পারি নাই। পরিবারের (স্ত্রী) নাম নাছিমা। হের বয়স আছিল ১৩।’

মানুষটা আলাপি। নাম মো. আনোয়ার। আনোয়ার মাঝি বলেই চেনে লোকে। চার ভাই, এক বোনের পরিবার। ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। চর মুদাফতেই বাড়ি। ছেলেবেলা থেকেই জলের সঙ্গে মিতালি। নিজেদের নৌকা ছিল। আনোয়ারের বাবা চালাতেন। পরে ছেলেরাও সে পথ ধরেছেন; কিন্তু বাবা চেয়েছিলেন আনোয়ার পড়ালেখা করে চাকরিবাকরি করুক। এ জন্য তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আনোয়ার ইশকুলে যাও। নাও চালানোর দরকার নাই।’ কিন্তু স্কুলের বাঁধা-ধরা জীবন ভালো লাগত না আনোয়ারের। ফলে প্রাইমারির গণ্ডি পার হতে পারেননি। প্রায়ই স্কুল কামাই করে নৌকায় বসে থাকতেন। কোনো কোনো সময় নৌকায় চড়ে দূর-দূরান্তে চলে যেতেন। প্রথম প্রথম মাঝিদের সহকারী ছিলেন। একসময় নৌকা চালানো শিখে গেলেন। এর পর থেকে ব্রহ্মপুত্রের বুকেই কাটিয়ে দিয়েছেন ২২টি বছর!

এখন প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। ৮টায় অষ্টমীর চর থেকে যাত্রী নিয়ে নৌকা ছাড়েন। রমনা ঘাট পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাড়ে ৯টার মতো বেজে যায়। সেখান থেকে যাত্রী নিয়ে অষ্টমীর চর। আবার বিকেল সাড়ে ৩টায় অষ্টমীর চর থেকে রমনা ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যান। এটাই এখন আনোয়ারের রুটিন।

তবে জরুরি মুহূর্তে এই রুটিনের হেরফের হয়। যেমন—কেউ অসুস্থ হলে, শহরে কারো জরুরি কোনো কাজ পড়লে কিংবা খারাপ আবহাওয়ায় কেউ আটকা পড়লে—যাই হোক না কেন, আনোয়ার মাঝি আছেন। অন্যরা যখন নৌকা নিয়ে বের হতে ভয় পান, সেখানে আনোয়ার মাঝি ভরসার হাত বাড়িয়ে দেন। ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে নৌকা বেয়ে চলেন। পার করে দেন বিপদে পড়া মানুষকে। আনোয়ার বলেন, ‘মনে করেন, ফোন দিল—আমারে পার করে নিয়া যাও। নিয়া গেছি। ডাক্তারখানায় দিয়া আইছি মাইনষেরে।’

যেমন—একবার তাঁদের গ্রামে এক গৃহবধূর প্রসব বেদনা উঠেছিল। রাত তখন ১টারও বেশি। তা-ও আবার বর্ষাকাল। গৃহবধূর স্বামী আনোয়ার মাঝির দ্বারস্থ হন। স্মৃতি হাতড়ে আনোয়ার বলেন, ‘ডেলিভারির রোগী, না করি ক্যামনে। আমারে ঘুম থেইক্যা জাগাইয়া তুলল। গামছাটা কাঁধে নিয়া নৌকা বাইর করছি। এই রাইত-বিরাইতে হেগোরে চিলমারী নামাই দিয়া আইছি।’

সেই নারীর পুত্রসন্তান হয়েছে জেনে খুশি হয়েছিলেন আনোয়ার। পরে আনোয়ারকে মিষ্টিমুখ করিয়েছেন সেই নারীর স্বামী।

স্বাভাবিক আবহাওয়ায় চলাচল করতে অসুবিধা হয় না। শীতকালে ঘন কুয়াশা এবং বর্ষা কিংবা বৈশাখে ঝড়-তুফানে কষ্ট হয়। বললেন, ‘ঝড়-তুফান আইলে একা ঠেকানো বড় কঠিন। ডুব কুয়াশায়ও যাওয়া-আসা কষ্ট।’ এ রকম একবার কনকনে ঠাণ্ডায় খুব বিপদে পড়েছিলেন। দিগভ্রান্ত হয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছিলেন। বললেন, ‘তিন-চাইর ঘণ্টা ঘুরছি। পরে ঠিক পাইছি।’ নৌকায় সেদিন ১৫-১৬ জনের মতো যাত্রী ছিল। ‘হেই সময় ছিল ডুব (ঘন) কুয়াশা। এক চরে গিয়া ঠেকল। মাইনষেরে সমাচার জিজ্ঞেস কইরা কইরা চইলা আইছি। অনেক দূর আইসা বউরে ফোন দিছি। হে হারিকেন জ্বালাইয়া রাখছে। হেইটা দেইখ্যা দেইখ্যা দিক ঠিক করছি।’ একবার ডাকাতের কবলেও পড়েছিলেন। ‘নৌকা নিয়ে যাবার লাগছি নয়ার চর। তখন রাইতের ৭টার মতো বাজে। যাত্রী বেশি ছিল না। দেখি আমার নৌকার পাছ পাছ আরেকটি নৌকা। প্রথমে যাত্রী নৌকাই মনে হইছিল। না। দেখলাম, ডাকাইত। আমারে দাবড়াইতাছে। অনেক দাবড়াইছে। আমিও আল্লা আল্লা করতে করতে নাও বাইছি। ধরতে পারে নাই।’

নৌকা চালিয়ে যা পান তাই দিয়েই সংসার চলে। আগে একাই চালাতেন। এখন তাঁর এক আত্মীয়ও তাঁকে সাহায্য করে। বললেন, ‘খেনে (কোনো) দিন ৩০০, খেনে দিন ৫০০, খেনে দিন লস পাই। মেলাটেলা হইলে ভাড়া বেশি। ঈদ, বৈশাখীর মেলা, অষ্টমীর মেলা হইলে ভালা কামাই হয়।’ 

আনোয়ার-নাছিমা দম্পতির এখন এক ছেলে, এক মেয়ে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেশ সুখেই আছেন আনোয়ার। ছেলে-মেয়েরা এখন স্কুলে যায়। আনোয়ারের স্বপ্নও এখন তাদের ঘিরে। বললেন, ‘আগে তো বুঝি নাই। এখন বুঝি। পোলা-মাইয়া দুইটারে পড়ালেখা করামু। ওরা বড় মানুষ অইব।’ ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে নৌকা চালাতে চালাতে সেই স্বপ্নই বুনে চলেছেন আনোয়ার।

ছবি : কুশল প্রসাদ মণ্ডল

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা