kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

আজ আমরাও

উদ্যোক্তার নাম ছবি সিকদার

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



উদ্যোক্তার নাম ছবি সিকদার

একাধিক ব্যাংকে ঘুরতে ঘুরতে ছবি শিকদারের জুতার তলা ক্ষয়ে গেছে। একটি ব্যাংক তো ঋণ দেবে বলে ছয় মাস ঘুরিয়ে পরে না করে দিয়েছে। তাই বলে ছবি কিন্তু থেমে থাকেন নি। তাঁর সাফল্যের বলছেন রাশেদুল তুষার

 

১৯৯৭ সালে হৃদেরাগে বাবা মনোরঞ্জন সিকদার হঠাৎ মারা যান। পুরো পরিবারটি বিপাকে পড়ে যায়। ছবি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। পড়ালেখায় ইস্তফা দিয়ে চট্টগ্রামের বাটালি রোডে ক্লিফটন গ্রুপের একটি কারখানায় হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন ছবি সিকদার। ওভারটাইম আর বোনাস মিলিয়ে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা পেতেন মাসে। এভাবে চলতে চলতে ২০১৬ সালে প্রায় ১৯ বছর পর তিনি এক্সিকিউটিভ হলেন। তখন সব মিলিয়ে বেতন পেতেন ৫০ হাজার টাকা। তত দিনে তাঁর জমানো টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ। ছবি চাকরি ছেড়ে দিলেন। স্বপ্নপূরণে নেমে পড়লেন। স্বপ্নটা তাঁর দীর্ঘদিনের—নিজের মতো কিছু একটা করবেন।

 

সেন্স ফ্যাশন লিমিটেড

জমানো টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন কিনলেন। ছোটখাটো একটি কারখানা গড়তে চাইলেন; কিন্তু লোকে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হলো, তবে মেশিন চালাতে দিতে চাইল না। ঘুরতে ঘুরতে একসময় ঘাটফরহাদবেগের খলিফাপট্টিতে একটি বাসা পেলেন। মালিক ছবিকে বুঝি সাহায্যই করতে চাইলেন। চার রুমের বাসা। একটিতে নিজের থাকার বন্দোবস্ত করলেন। অন্য তিনটিতে ১০টি মেশিন বসালেন। ছয়জন অপারেটর সঙ্গী করলেন। চালু করলেন স্বপ্নের কারখানা। নাম ‘সেন্স ফ্যাশন লিমিটেড’। তবে এক বছরের মাথায়ই বুঝতে পারলেন তাঁর আরো বড় জায়গা দরকার।

৬০টি মেশিন বসালেন

সেটা মার্চ মাস ছিল। ২০১৮ সাল। পাঁচ হাজার বর্গফুটের বিশাল ফ্লোর। সেন্স ফ্যাশন নয়া উদ্যমে কাজ শুরু করল। ১০৫ জন কর্মী। ছবি বললেন, ‘এ পর্যায়ে প্রায় ৭০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তবে কোনো লোন নিইনি। পুরোটাই ব্যবসার লাভ থেকে।’  বড় বড় কারখানা থেকে কাজ নিয়ে আসেন ছবি। মানে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করেন। লেডিস আন্ডারওয়্যার, শিশুদের পোশাক ইত্যাদি তৈরি করেন। মাসে কারখানা ভাড়া ৬০ হাজার টাকা। বেতন বাবদ খরচ পাঁচ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিল ও আরো সব খরচ মিলিয়ে মোট আট লাখ টাকা ব্যয় হয়।

ছবি বললেন, ‘এই খরচ সামলে অবশিষ্ট যা থাকে তাতেই আমি খুশি। একসঙ্গে বেশি লাভ করতে চাই না। যেহেতু নিজে শ্রমিক থেকে আজকের অবস্থানে এসেছি, তাই আমি জানি শ্রমিকদের কোথায় কী সমস্যা। তাদের খুশি রাখার চেষ্টা করি। আমি জানি গালি দিয়ে কাজ হয় না; বরং তাদের একজন হয়ে তাদের সুখ-দুঃখের সাথি হয়ে থাকতে পারলে সর্বোচ্চটা আদায় করা যায়।’

 

স্বপ্ন বড়

ছবি স্বপ্ন দেখেন, একদিন মাদার ফ্যাক্টরির মালিক হবেন। সরাসরি বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে কাজ করবেন। নিজের নবম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলেকে তৈরি করছেন সে চিন্তা মতো। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যেহেতু কর্মজীবী, তাই ভারতের কলকাতায় শাশুড়ির কাছে রেখে ছেলেকে পড়াচ্ছেন একটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। মায়ের ইচ্ছা, ছেলে একদিন ব্যবসার হাল ধরবে। ছবি বলেন, ‘আমি তেমন পড়ালেখা করতে পারিনি। তাই চেষ্টা করছি সন্তান যেন সব সুযোগ পায়। আমি প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় দিই কারখানায়। একটি মাদার ফ্যাক্টরির মালিক হওয়ার ইচ্ছা; কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন বিশাল বিনিয়োগ।’

উদ্যোক্তা নারীদের জন্য সহজ শর্তে এসএমই লোন দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। ছবি অবশ্য এ ব্যাপারে আশাবাদী নন। বলছিলেন, মুখে মুখে অনেক কথাই শুনি। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। সবাই সম্পত্তি বন্ধক রাখতে চায়। আমার যদি সম্পত্তিই থাকত তাহলে তো লোনের জন্য যেতাম না, বরং সেটা বিক্রি করে বিনিয়োগ করতাম।’

এ জন্য তিনি এক মিনিটের জন্য হলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চান। জানাতে চান নিজের শূন্য থেকে উঠে আসার গল্প। আরো শতাধিক নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির সংগ্রামের ইতিহাস। বিনিময়ে শুধু সহজ শর্তে নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য অর্থ চান। তাঁর বিশ্বাস, সহায়তা পেলে দেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে এমন আরো অনেক ছবি সিকদার উঠে আসবেন।

 

     ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা