kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুখী হও বাংলাদেশ

আমাদের একজন মেহেদীও আছেন

মেহেদী রশিদ আমেরিকার বিশ্বখ্যাত প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান মোফাট অ্যান্ড নিকোলের সিনিয়র স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও একজন শেয়ারহোল্ডার। ম্যারিল্যান্ডের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সভাপতিও তিনি। আমেরিকার কিছু বন্দর ও সেতুর নকশা তিনি করেছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন আতাউর রহমান কাবুল ও তাহসিন চোকদার

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমাদের একজন মেহেদীও আছেন

নরফোক নেভাল শিপইয়ার্ড

তখন ফরিদপুর জেলা স্কুলের ছাত্র মেহেদী। টেলিভিশন বা ক্যালেন্ডারে দেখা বড় বড় চকমকে ভবনগুলো তাঁকে টানত। বেশি ভালো লাগত ম্যাকগাইভার টিভি সিরিজে দেখা ফিনিক্স ভবনটি। আর ভালো লাগত বিজ্ঞান পড়তে। অঙ্ক করতেও ভালোবাসতেন। গতিবিদ্যা, স্থিতিবিদ্যা তাঁর বিশেষ পছন্দের বিষয় ছিল। ১৯৯৩ সালে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ঢাকায় এসে বুয়েটে ভর্তি হলেন পুরকৌশলবিদ্যায়। পুরকৌশলবিদ্যায় পড়ার বিষয় অনেক, যেমন—মহাসড়ক নির্মাণকৌশল, কাঠামো বিশ্লেষণ ও নকশা, ভবন নির্মাণকৌশল, কংক্রিট ডিজাইন, উপকরণ বিশ্লেষণ, মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, স্টিল ডিজাইন ইত্যাদি। যারা ক্লাসে ওপরের দিকে থাকে, তারা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংকেই বেছে নেয় শেষ পর্যন্ত। মেহেদীও শেষ বর্ষে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংকেই বেছে নিলেন। ২০০০ সালের জুনে তাঁর পরীক্ষাও হয়ে গেল। আগস্টে মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমালেন। সাউথ ডাকোটা স্কুল অব মাইনস অ্যান্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হলেন। তাঁর তেমন অসুবিধা হয়নি নতুন দেশে গিয়ে, বিশেষ করে পড়াশোনায়। বুয়েটে পড়াশোনার মানকে তিনি আমেরিকার সমপর্যায়ের বলেই উল্লেখ করলেন। অন্তত তখনকার সময়ের। বি এম দাসের সয়েল মেকানিকস নামের বইটি যেমন আমেরিকায়ও কমন পেয়েছিলেন।

 

ডাকোটায় আরো

ডাকোটায় গিয়ে মাঠপর্যায়ের (ফিল্ড ট্রিপ) পড়াশোনায় বেশি আনন্দ পাচ্ছিলেন। শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে তিনি নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনায় ঘুরে বেড়াতেন। পছন্দ করেন বেশি নির্মাণাধীন স্থাপনা দেখতেই। কারণ নির্মাণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তো আসলে খুব বেশি কিছু দেখা যায় না। বলছিলেন, ‘মানুষের শরীরের কথাই ধরুন, গোটাটাই ঢাকা চামড়ায়। চামড়ার ভেতর উঁকি দিলে তবেই না হাড়গোড় দেখতে পাবেন। তখন আপনার সামনে পিঠের গড়ন, বুকের গড়ন, পায়ের গড়ন সব আলাদা আলাদা ধরা পড়বে। একটি ভবন শেষ হয়ে গেলে কিন্তু আপনি সেভাবে তার কাঠামো বুঝতে পারবেন না। তাই আমার কাছে সব সময়ই নির্মাণাধীন স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।’  

পড়া শেষ হলে মেহেদী ভার্জিনিয়ার স্থানীয় একটি বন্দর ও সেতু নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে কাজ নিলেন। সাত বছর ছিলেন সে প্রতিষ্ঠানে। তারপর ২০০৮ সালে যোগ দিলেন মোফাট অ্যান্ড নিকোলে।

 

মোফাট অ্যান্ড নিকোল

বন্দর ও সেতু নির্মাণে মোফাট অ্যান্ড নিকোল নাম করেছে খুব। লস অ্যাঞ্জেলেসে এর হেডকোয়ার্টার। শুধু আমেরিকায়ই ৩৫টি অফিস আছে। ২০০৮ সালে মেহেদী মোফাটের নরফোক কার্যালয়ে যোগ দেন। তারপর ২০১৬ সালে বাল্টিমোরের ম্যারিল্যান্ড অফিসে প্রধান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিলেন। তিনি এখন বাল্টিমোরে একটি হাই ভোল্টেজ পাওয়ার লাইন নদীর এক মাথা থেকে আরেক মাথায় পৌঁছে দিচ্ছেন। এর বাজেট ২৫০ মিলিয়ন ডলার। মেহেদী মোফাটে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নরফোকে একটি নেভাল শিপইয়ার্ড নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। সেটি বাস্তবায়িত হতে আট বছর সময় লেগেছিল। বলছিলেন, প্ল্যানিং (পরিকল্পনা) একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শিপইয়ার্ড গড়তে গিয়ে আমরা শুধু গবেষণাই চালিয়েছি দুই বছর। নকশা করেছি ৭০০ পৃষ্ঠা। পুরো প্রকল্পটি তুলে ধরতে তিন হাজার পৃষ্ঠা লেগেছে। এর মধ্যে বাজেট, নকশা, শিডিউল ইত্যাদি যেমন আছে, সেই সঙ্গে আছে পরিবেশের ক্ষতি না করে স্থাপনা নির্মাণের কৌশলগুলোর বর্ণনা। আমেরিকায় স্থাপনা গড়তে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের অনুমতি লাগে। তারপর লাগে পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু অনুমতিপত্র জোগাড় করতেই দুই বছর লেগে যায়। আমেরিকায় জলভাগে জানুয়ারির শেষ থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত কোনো স্থাপনা গড়া যায় না। কারণ এটি  স্টার্জেনসহ আরো সব মাছের প্রজনন সময়। এখন যেমন বাল্টিমোরের পাওয়ার লাইন ব্রিজ গড়তে গিয়ে আমাদের খুব হুঁশিয়ার থাকতে হচ্ছে ডলফিনের চলাচল পথ নিয়ে। পাখির উড়ে যাওয়াও যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সে ব্যাপারটিও খেয়াল রাখতে হচ্ছে। তারপর মাথায় রাখছি পাইলিংয়ের সময় যেন শব্দ বেশি না হয়। কারণ এতে আশপাশের মানুষ বিরক্ত হতে পারেন। জলভাগে কাজ তো যুদ্ধ করার মতো ব্যাপার।  স্রোতের সঙ্গে সব সময় পলি জমা হয়, তারপর মাটি সরে যায় ইত্যাদি অনেক সমস্যা। সব বিষয়ই প্রকল্প শুরুর আগে ভেবে ফেলতে হয়।

 

পদ্মা সেতুর কাজ ভালো লেগেছে       

দিন কয়েক আগে ফরিদপুর গিয়েছিলেন মেহেদী। পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ রোড ধরে ড্রাইভ করেছেন। বলছিলেন, ‘‘এখানে কাজ হচ্ছে আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ডে। ‘এ ই কম’ নামের একটি আমেরিকান নামি প্রতিষ্ঠান এর নকশা করেছে। মোফাট অ্যান্ড নিকোলের প্রতিদ্বন্দ্বী এ ই কম। আমাদের দেশে সমস্যা হলো লেবার ফোর্সে। দক্ষ শ্রমশক্তি এখানে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আমেরিকায় সব কাজের পরিকল্পনাটা খুব ভালো হয়। সেখানে কাজ এক দিনও পেছায় না। ওদের কাছে টাইম ইজ মানি। তাই কাজ যদি পেছায়, তবে যার কারণে পিছিয়েছে তাকে বিরাট অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। সরকারও রেহাই পায় না এ ক্ষেত্রে। আমাদের মোফাট অ্যান্ড নিকোল সাউথ ইস্ট এশিয়ায় কাজ করতে আগ্রহ দেখায় না। প্রধান কারণ এখানে সময়ের মূল্য কম দেওয়া হয়। টাকা-পয়সার লেনদেনেও অনেক ঝামেলা হয়। মিয়ানমারে আমরা একটি বন্দর গড়তে গিয়েছিলাম। সেখানে মন্দ অভিজ্ঞতা হয়েছে।’’

 

ব্যক্তিজীবন

মেহেদী এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। সকাল ৭টায় নাশতা করে অফিসে বের হন। দুপুরের খাবারও বাসা থেকে নিয়ে যান। মসলাদার খাবারই খান বেশি। নিউ ইয়র্কে বোনের বাসায় ছুটি কাটাতে যান প্রায় সময়। টাকার পেছনে নয়, স্বপ্ন পূরণে ছোটেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা