kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফেসবুক থেকে পাওয়া

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফেসবুক থেকে পাওয়া

মনের আয়নায় দেখি

তখন ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম। রাজ্যের পড়াশোনা আর ব্যস্ততা। রাত পোহালেই শুরু হবে ভর্তি পরীক্ষা নামক যুদ্ধ। ঠিক এমন এক তীব্র উৎকণ্ঠার রাতেই আমাদের সাক্ষাৎ। চূড়ান্ত উদ্বেগের মুহূর্তেও নির্লিপ্ত থাকার কৌশলটা ওর অনেক আগ থেকেই রপ্ত ছিল। যাহোক, ওর মতো ও বলে যাচ্ছে আর আমি শুনে যাচ্ছি। কিছু প্রশ্নের জবাবে ‘হুঁ’, ‘হাঁ’ বলছি। অন্য দিনের মতো ‘ভালো লাগে না’ কথাটি একবারের জন্যও বলেনি। হঠাৎ ও বলে বসল—‘আচ্ছা এনটি করিম ভাইয়া, প্রশ্ন তো ইংলিশে হবে, আমি যদি কোনো ইংরেজি শব্দ না বুঝি, তবে বাংলা অনুবাদটা কোথায় পাব?’

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, রহস্যজনকভাবে আমার নামের সঙ্গে ওই ভিনদেশি বর্ণদ্বয় যোগ করার বাতিক আছে তার। জিজ্ঞেস করলে অ্যাব্রিভিয়েটেড ফর্মে বলে, ‘নিউ টেকনোলজি’, যা নাকি আমার প্রযুক্তি আসক্তি নির্দেশ করে।

অ্যাডমিশন টেস্টের প্রশ্নে সাধারণত ইংলিশের সঙ্গে ব্র্যাকেটে বঙ্গানুবাদ থাকে, তাকে বলি আমি।

পাল্টা প্রশ্ন—ওটা দেখলে কোনো সমস্যা হবে না তো? নম্বর কাটবে না কি আবার!

অনেক কষ্টে হাসি সংবরণ করে বলেছি, ‘না কোনো সমস্যা নেই, তবে চুপিসারে দেখো; কেউ যেন না দেখে।’

ওই রাতের পর আর কোনো দিন আমাদের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও না। এখনো দুজন দুজনকে দেখি, তবে সেটা মনের আয়নায়।

এম আর করিম

জাবি, সাভার।

 

ইচ্ছাটা হোক আকাশছোঁয়া

আমাদের সময় মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রিপারেটরি স্কুল ছিল বেশ নামকরা। আমি সেই স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। তাই আমার মধ্যে অহংকার কাজ করত এই ভেবে যে—আমি ভালো স্কুলে পড়ি। আশপাশের স্কুলের মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে আর নিজের স্কুলকে বেশ ওপরে রাখতাম। তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। আমাকে বাসায় যে স্যার পড়াতেন এক দিন তিনি বললেন, ‘তোমার গণ্ডিটা আটকে আছে ওই প্রিপারেটরিতেই। তাই অন্যদের তুলনায় নিজেকে খুব ওপরে ভাবছ; কিন্তু নিজের গণ্ডিটা বড় করলে দেখবে, তোমার জানাশোনায় কত ঘাটতি! আশপাশের কম পরিচিত স্কুলের ছাত্রীদের তুলনায় তোমার নেভি ব্লু আর সাদা পোশাকটা হয়তো ওপরে; কিন্তু যখন তুমি হলিক্রস, রাজউক এমন স্কুলের সামনে যাবে, তখন তুলনা করে দেখো খানিকটা হলেও পিছিয়ে আছো।’

শুনে খুব মন খারাপ হয়েছিল। এ কেমন কথা! আজ অনেক বছর পর অবশ্য বুঝতে পারছি কেন স্যার ওই কথা বলেছিলেন।

আমরা পরিচিত গণ্ডিতে নিজেকে সর্দার ভাবি; কিন্তু গণ্ডি পেরোলেই বোঝা যায়, আমাদের জানা-বোঝায় কত্ত ঘাটতি! নিজের পাড়ায় নাকি বিড়ালও বাঘ হয়ে যায়। আমাদের বড়াই করার ধরনও দিন দিন তেমন হয়ে যাচ্ছে।

নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিধি বাড়ান, দেখবেন কত শত অজানা জিনিস ভিড় জমাচ্ছে চোখের সামনে। কখনো এমন যেন না হয় যে পাড়া জয় করেই আপনি বিশ্ব জয়ের বড়াই করছেন। আপনার জয়ের ইচ্ছা হোক আকাশচুম্বী। তাহলে মেঘটা অন্তত ছুঁতে পারবেন! 

নিশীতা মিতু

ঢাকা।

 

ভালো থেকো সুপর্ণা

কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে চট্টগ্রাম যাচ্ছি। কামরায় হঠাৎ পরিচিত মুখ। জানালার পাশেই আমার সিট। ওপাশের সিটে সুপর্ণা! এত বছর পরে দেখা। কিছু বলতে গিয়েও পারলাম না। সুপর্ণাও চুপ করে রইল। তবে চিনেছে এটা বুঝতে পেরেছি। ময়ূরকণ্ঠী রঙের সালোয়ার-কামিজে ওকে লাগছে বেশ। মাঝেমধ্যে চোখাচোখি। ট্রেনের হুইসেল। সময়ের ঘণ্টা বাজল, ট্রেন ছাড়ল। শীতের রাতে ছুটছে ট্রেন। সেই কবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছি। কিছু অভিমান জাল বুনেছিল আমাদের মধ্যে। তবে সে আমার ভালো বন্ধু ছিল, প্রেমিকাও। যাই হোক, সাহস করে বলে ফেললাম

—কেমন আছো?

—ভালো! তুমি?

—হুম।

আরো দু-একটি প্রশ্ন করলাম। কোনোটার উত্তর দিল কোনোটার দিলই না। সারা রাত তেমন আর কথা হলো না। সকাল হলো, ট্রেনও গন্তব্যে। স্টেশনে আগে থেকেই ওর বন্ধুরা ছিল। নামার আগে এক টুকরো কাগজ দিলাম তার হাতে গুঁজে, তাতে লিখে ছিলাম—‘ভালো থেকো সুপর্ণা।’

দুই দিন ধরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করলাম। চট্টগ্রামে এলে বন্ধু তন্ময়ের সঙ্গে দেখা করতেই হবে। ও ফ্যামিলি নিয়ে থাকে। তন্ময়ের সঙ্গে রাতে ডিনার শেষে ল্যাপটপে কাজ করছি। ফোনে রিং। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ‘কেমন আছো? ট্রেনের মেয়েটা বলছি।’ কণ্ঠ শুনে বুঝলাম, সুপর্ণা।

—ভালো। নম্বর কী করে পেলে?

—রাশেদের কাছ থেকে আগেই নিয়েছিলাম। তবে ফোন দিইনি। আর দিয়েই বা কি হবে। কাপুরুষের মতো চলে যাওয়া লোকটাকে কেনই বা খুঁজব। বলেছিলাম বাসায় গিয়ে বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে। যার সেই সাহসটুকু নেই, তার আবার প্রেম করার শখ। আমার তো বাবার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না জানতে। কই তুমি তো আর যোগাযোগ করলে না?

—আমার যা অবস্থা ছিল যোগাযোগ করব কী করে? বাবার বয়স হয়েছে, মাও অসুস্থ, ছোট ভাইয়ের পড়ার খরচ, সংসারের বোঝা—সবই মাথার ওপর। মাস শেষে মানিব্যাগে যে কয় টাকা থাকত চলাই দায়। টিউশনি করে কি এমন হতো। শুনেছিলাম তোমার বিয়ে হতে যাচ্ছে, সব ঠিকঠাক, তাই আর ফিরতে চাইনি। বাদ দাও ওসব। এখানে কেন এসেছ?

—সরকারি চাকরি, পোস্টিং হয়েছে এ শহরে।

—বিয়ে করেছ?

—বছর দুই হলো।

—শুধু একটা কথা জানতে ফোন করেছি। এত বছর যাকে মনে পড়ল না, সেদিনও কি কথা না বললে হতো না?

—পারলাম না। স্মৃতিরা আনাগোনা করছিল।

—তোমার আবার স্মৃতি। ওসব মনে আছে তোমার?

—বাহ্ থাকবে না কেন? রাশেদের জন্মদিনে সেই শেষ দেখা। সবার আসার কথা ছিল ১১টায়। আমি আসলাম প্রায় ১টায়।  আসতেই তুমি খুব বকা দিলে। ‘স্যরি’ বলেও লাভ হলো না। বললে, তোমার চোখের সামনে যেন না পড়ি। সেই চলে যাওয়া। তুমিও আর খোঁজ নিলে না!

যা হোক, আরো অনেক কথা হলো। সুপর্ণা বিদায় নিতে চাইল। বলল, ‘খুব ভোরে উঠতে হবে।’

‘গুডনাইট’ বলে ফোন রেখে দিলাম। পরে তাকে এসএমএস পাঠিয়েছিলাম—‘সুপর্ণা, ভোরে যখন তোমার ঘুম ভাঙবে দেখবে তোমায় একটা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ উপহার দিয়েছি। ভালো থেকো।’

মিলন মাহমুদ রবি

বার্তা প্রযোজক, বাংলাভিশন।

 

আসি তবে, ধন্যবাদ

সূর্য ডুবি ডুবি করছিল। রামপুরা থেকে বাসে উঠলাম। পাশের সিটে একটি মেয়ে। চোখে পুলিশ ব্র্যান্ডের চশমা। মনে হয়, ধনী পরিবার থেকে উঠে আসা। মহাখালীর আমতলী নেমে গেল। বনানী ডিওএইচএসের সামনে দিয়ে যখন বাস যাচ্ছে, খেয়াল করলাম আমার ব্যাগের পাশে একটা ফোন পরে আছে। তাতে রিং হচ্ছে। কলটা রিসিভ করলাম। ওপ্রান্ত থেকে বলল—হ্যালো! এটা কোথায়?

—মিরপুর ডিওএইচএস।

—আপনি যে ফোনে কথা বলছেন, ওটা আমার।

—বুঝতে পেরেছি। কোথায় আছেন? আপনার ফোন হলে ডিওএইচএসের সামনে আসুন।

—আচ্ছা, ধন্যবাদ বলেই কল কেটে দিল। আমিও বাস থেকে নেমে পড়লাম।

ফোনের মালিকের জন্য অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি এলো। অন্য একটা ফোন বের করে আমার কাছে থাকা তার ফোনে কল দিল। আমি ‘আপু’ বলে ডাকলাম। ভেবেছিলাম, এক কাপ কফি অফার করবে; কিন্তু ফোনটি হাতে পাওয়া মাত্র চওড়া হাসি দিয়ে বলল, ‘আসি তবে, ধন্যবাদ!’

গালিব মিয়া

গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

মিরপুর, ঢাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা