kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

ইতিহাসের খেরো খাতা

এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা

সারা বিশ্বে তখন সাধারণ দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া পশুশালা মাত্র তিনটি; এমনকি লন্ডনেরটিও ভবিষ্যতের গর্ভে। উনিশ শতকে লর্ড ওয়েলেসলি ব্যারাকপুরে তৈরি করেছিলেন এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা। সেই চিড়িয়াখানা এখন আগাছার জঙ্গলে ঢাকা। আনন্দবাজার পত্রিকার অমিতাভ কারকুন দেখতে গিয়েছিলেন

২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা

শিল্পী চার্লস ডয়লির আঁকা ছবিতে ১৮২০ সালের ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা। ডান দিকে পশুশালা, অদূরেই পাখিশালা।

ঘন গাছপালায় পথ ভুল হওয়ার উপক্রম। দিনের বেলাতেও ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। বিশ্বাস করা মুশকিল, শ্যামবাজার যাওয়ার রাস্তা এখান থেকে মাত্র তিন শ গজ দূরে! সরকারি অনুমতি নিয়ে লাট সাহেবের খাস বাগানে ঢুকেছি; উদ্দেশ্য—বইয়ে পড়া আর ছবিতে দেখা ‘ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা’ নিজের চোখে দেখা। গাইড এক বর্ষীয়ান মালি সরকার। জানালেন, ৩০ বছর আগে বাগানের এই অংশে কিছু ভাঙা বাড়িঘর দেখেছিলেন, তার পরে আর এ দিকে আসেননি। ঘন গাছগাছালি ভেদ করে দৃষ্টি বেশি দূর যায় না। বহু জায়গায় হাঁটতে হচ্ছে আগাছার আস্তরণের ওপর দিয়ে। একটু আগে বাগানের পুরনো ‘প্ল্যান্ট অ্যান্ড সিড হাউস’-এর ভগ্নাবশেষ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, এখন লক্ষ্য চিড়িয়াখানার বাড়িঘর। এক জায়গায় গাছপালা কম। দেখি লতাপাতার আবরণে এক ভগ্ন সৌধের অবয়বটুকু শুধু বোঝা যাচ্ছে। ভালো করে দেখে, ১৮৫১ সালে ফ্রেডরিক ফিবিগের তোলা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে যখন চিনতে পারলাম, আনন্দে হৃৎস্পন্দন বুঝি কিছু ক্ষণের জন্য থেমেই গেল। অপূর্ব গথিক স্থাপত্যে তৈরি এক পাখিশালার ধ্বংসাবশেষ। মূল প্রবেশপথটি এখনো চেনা যায়। ভেতরে ঢুকে বাঁ দিকে একটি মাত্র গ্যালারি এখনো দাঁড়িয়ে। সেখানে দর্শক যাওয়ার পথের দুই ধারে ছোট পাখির খাঁচা রাখার জন্য রয়েছে টানা প্ল্যাটফর্ম আর সারিবদ্ধ জানালা। ছাদ বলে কিছু নেই। অসংখ্য গাছের শিকড় ঝুলে থাকায় ভেতরে ঢোকা গেল না। প্রবেশপথের পরে পথের দুই ধারে পর পর খিলান, বড় পাখি রাখার জায়গা। একটু ঘোরাফেরা করতেই পাওয়া গেল গাছপালার ভিড়ে, বড় বেসিনসহ সুন্দর এক ফোয়ারার অবশেষ। লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে থাকা ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানার অবশিষ্টাংশ দেখা হলো এভাবেই।

লর্ড ওয়েলেসলি

তখন চিড়িয়াখানা ছিল মাত্র তিনটি

১৮০২-১৮০৩ খ্রিস্টাব্দ। তখনো পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে সাধারণ দর্শকদের জন্য চিড়িয়াখানা খোলা হয়েছিল মাত্র তিনটি। প্রথমটি ভিয়েনায় (১৭৬৫), দ্বিতীয়টি মাদ্রিদে (১৭৭৫), তৃতীয়টি প্যারিসে (১৭৯৫); এমনকি ‘জুওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন (১৮২৬)’ তখনো তৈরি হয়নি। রাজরাজড়াদের চিড়িয়াখানায় প্রজাদের প্রবেশাধিকার নেই। ভাবলে অবাক লাগে, এমন একসময়ে কলকাতা থেকে ১৬ মাইল উত্তরে, ব্যারাকপুরে খোলা হলো এশিয়ার প্রথম আর খুব সম্ভবত পৃথিবীর চতুর্থ এই চিড়িয়াখানা, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল। বৈপ্লবিক এই কাজটি করেছিলেন ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড রিচার্ড ওয়েলেসলি।

তিনি গভর্নর জেনারেল পদে কলকাতায় ছিলেন ১৭৯৮-১৮০৫ সাল পর্যন্ত। তাঁর মনে হয়েছিল, এশিয়ার ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে যেসব পশু-পাখি পাওয়া যায়, সেগুলোর একটি বিজ্ঞানসম্মত ও রঙিন ছবিওয়ালা বিস্তারিত বিবরণ তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ ইউরোপীয় বিদ্বজ্জনদের এ বিষয়ে জ্ঞান অসম্পূর্ণ। শুরু করলেন এশিয়ার প্রথম প্রকৃতি গবেষণা, ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ কার্যক্রম। প্রাণী সংগ্রহ শুরু হলো। তাদের রাখা হলো গার্ডেনরিচে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল এই কার্যক্রম ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তা যখন সম্ভব হলো না, ওয়েলেসলি তাঁর প্রকৃতি গবেষণা কার্যক্রম আর সব পশু-পাখি নিয়ে এলেন ব্যারাকপুর পার্কে। বিখ্যাত প্রকৃতিবিদ ফ্রান্সিস বুকাননকে এই গবেষণাকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন। স্থির করলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ উপনিবেশগুলোর সামরিক-অসামরিক অফিসগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হবে, পশু-পাখির নমুনা সংগ্রহে সব জায়গার মেডিক্যাল অফিসারদের যেন তাঁরা সাহায্য করেন। সিদ্ধান্ত হলো, এই গবেষণাসংক্রান্ত সব চিঠিপত্রের খামের ওপরে লেখা হবে ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’, তা হলেই ডাক মাসুল মওকুফ। তখনো ‘জুওলজিক্যাল গার্ডেন’ বা ‘জু’ শব্দটির প্রচলন হয়নি। পশু-পক্ষীশালাকে বলা হতো ‘মিনাজেরি’ (গবহধমবত্রব)। ১৮০৪ সাল পর্যন্ত ব্যারাকপুরে ওই পশু-পাখির রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয়েছিল ২৭৯১ টাকা ৮ আনা ৬ পয়সা। গবেষণার জন্য সংগৃহীত এসব পশু-পাখি নিয়েই শুরু হয়েছিল ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা। ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া কর্মকাণ্ডের জন্য মাসিক এক হাজার টাকা খরচ ধার্য হয়েছিল। দুঃখের বিষয়, ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ার কাজ খুব একটা এগোয়নি। ১৮০৫ সালে লর্ড ওয়েলেসলি ও বুকানন ইংল্যান্ডে ফিরে গেলে ব্যারাকপুরে প্রথম প্রকৃতি গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। চিড়িয়াখানাটি কিন্তু থেকে যায় আরো ৭৫ বছর। আজও বিশ্বের ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ চর্চার ইতিহাসে ব্যারাকপুরে স্থাপিত প্রথম প্রকৃতি গবেষণা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়, আলোচনা করা হয় ওই চিড়িয়াখানার কথা। সেদিন যে পাখিশালার ধ্বংসাবশেষ দেখেছিলাম, তা ওই ১৮০০ সালে শুরু হওয়া ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানার শেষ চিহ্ন। আজও তা রয়েছে ওভাবেই।

ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানায় জিরাফ। ১৮৫১ সালে ফ্রেডরিক ফিবিগের তোলা ছবি, হাতে রং করা।

ব্যারাকপুরের অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল লন্ডনে

১৮২৮ সালে লন্ডন চিড়িয়াখানা স্থাপিত হয়। ‘জুওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি স্যার টমাস স্ট্যামফোর্ড র‌্যাফেল তার আগে দুইবার ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিলেন। বোঝাই যায়, লন্ডন চিড়িয়াখানা স্থাপনের সময় ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছিল। ভারতে আসা যেসব ভ্রমণকারী গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয়দের অতিথি হয়েছেন, তাঁদের অনেকের লেখায়ই এই চিড়িয়াখানার উল্লেখ আছে। মিসেস গ্রাহাম এসেছিলেন ১৮১০ সালে। তাঁর লেখায় পেলিক্যান, সারস, ফ্লেমিংগো, উটপাখি, ক্যাসুয়ারি, জাভার পায়রা, দুটি বাঘ, দুটি ভালুকের বিবরণ পাওয়া যায়।

১৮১৭ থেকে ১৮১৯ সালের মধ্যে লর্ড হেস্টিংসের আমলে তৈরি হয় নতুন এক পাখিশালা, ১৮২২ সালে আর একটি পশুশালা। দুটিই ছিল এখনকার ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা মোড় থেকে মাত্র ২০০ ফুট দূরে, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। স্যার চার্লস ডয়লির আঁকা, খাঁচায় বাঘ, সিংহসহ ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানার ওই পাখিশালা ও পশুশালার পেইন্টিং পৃথিবী বিখ্যাত। পাখিশালাটির ছবি তুলেছিলেন ফ্রেডরিক ফিবিগ। বাঘ-সিংহের খাঁচাগুলো ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত ছিল। পাখিশালার এই বাড়িটি ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে ছিল ২০১৪ সাল পর্যন্ত। পাশে একটি নতুন সরকারি ভবন তৈরি হওয়ার পর সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

 

নতুন করে সাজিয়েছিলেন লর্ড অকল্যান্ড

১৮২৩ সালে লর্ড আমহার্স্ট জানাচ্ছেন, চিড়িয়াখানায় রয়েছে তিব্বতি বাইসন, দক্ষিণ আফ্রিকার গাধা, বাঘ, ভালুক, লেপার্ড, শজারু, ক্যাঙারু, বাঁদর, মাউস ডিয়ার ও বিভিন্ন রকমের পাখি। ১৮২৯ সাল নাগাদ ফরাসি প্রকৃতিবিদ ভিক্টর জাকমেঁর পর্যবেক্ষণ—লর্ড বেন্টিংয়ের আমলে খরচ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই প্রাণীর সংখ্যা কমেছে। লর্ড অকল্যান্ড গভর্নর জেনারেল হয়ে ভারতে আসেন ১৮৩৬ সালে। তিনি ও তাঁর দুই বোন—এমিলি ও ফ্যানি ইডেন ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানাকে আবার নতুন করে সাজিয়ে তোলেন। সেই সময় ‘গণ্ডার পুকুর’-এ ছিল গণ্ডার, ‘হরিণ পুকুর’-এর বেড়া ঘেরা জায়গায় বহু হরিণ, ‘বেয়ার পিট’-এ ভালুক, চিতা, সাদা বাঁদর, বেবুন, জিরাফ আর দেশ-বিদেশের বহু পাখি।

 

(সংক্ষেপিত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা