kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

লোকনায়ক

আলোর ফেরিওয়ালা

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের এজিএম শেখ আবদুর রহমান। গ্রাহক হয়রানি বন্ধে ও গ্রাহকসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আলোর ফেরিওয়ালা নামে নতুন এক কার্যক্রম শুরু করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগকে মডেল হিসেবে নিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। লিখেছেন এম সাইফুল মাবুদ

২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আলোর ফেরিওয়ালা

নিজ কার্যালয়ে শেখ আবদুর রহমান

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার তাহের হুদা গ্রাম। মোটরবাইকে চড়েই যাচ্ছিলাম। সামনে ছোটখাটো একটা জটলা দেখে থামতে হলো। একটা ভ্যানগাড়ি ঘিরে মানুষের ভিড়। সাধারণ ভ্যানের চেয়ে কিছুটা আলাদা এটি। সামনে একটি সাইনবোর্ড। তাতে বড় হরফে লেখা, ‘আলোর ফেরিওয়ালা’। তার নিচে ছোট ছোট হরফে লেখা ‘দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ’। দ্রুত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমাধানসহ নানা কথাবার্তা। গাড়ির ওপরে বিদ্যুতের মিটার, তারসহ নানা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে কত টাকা লাগবে, প্রক্রিয়া কী ইত্যাদি মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন একজন। নাম শেখ আবদুর রহমান। হরিণাকুণ্ডু উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার। হাসিমুখে বললেন, ‘ভাই, মানুষের ভোগান্তি কমানোর চেষ্টা করছি। বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে যাচ্ছি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।’

বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের বিরূপ ধারণা পাল্টে দিয়েছেন শেখ আবদুর রহমান। তাঁর উদ্যোগের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার জন্য হরিণাকুণ্ডুর মানুষকে এখন আর অফিসে গিয়ে ধরনা দিতে হয় না; বরং বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারাই এখন ভ্যানগাড়িতে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন সংযোগ দিয়ে আসছেন। কোনো হয়রানি নাই, লাইন নাই, ঘুষ নাই। আবদুর রহমানের এই উদ্যোগের নাম ‘আলোর ফেরিওয়ালা, পল্লী বিদ্যুৎ দুয়ার মিটারিং কার্যক্রম’। গত ২৪ ডিসেম্বর এর উদ্বোধন করেন ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আলতাফ হোসেন। ওই দিনই ১৩টি নতুন সংযোগ দেওয়া হয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত (২০ জানুয়ারি) মোট ৩০৪টি নতুন সংযোগ দিয়েছেন তাঁরা।

 

যেভাবে চলছে কার্যক্রম

হরিণাকুণ্ডু উপজেলার আটটি ইউনিয়নে মোট ১৩৬টি গ্রামে তিন লক্ষাধিক মানুষের বাস। সেখানে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক ৩৭ হাজার ৬৮১ জন। প্রতিদিন সকালে গ্রামে গ্রামে ঘুরছে পল্লী বিদ্যুতের দুটি ভ্যানগাড়ি। প্রতিটি ভ্যানে মিটার, তার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সংযোগের সব সরঞ্জাম থাকছে। আছেন একজন ওয়্যারিং পরিদর্শক, দু্জন লাইনম্যান। গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন তাঁরা। কেউ বিদ্যুৎ নিতে চাইলেই তিনি বাড়ি বসেই সংযোগ পেয়ে যাবেন। যাঁরা নতুন সংযোগ নিতে আগ্রহী, তাঁদের মোট ৫১৫ টাকা দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে সদস্য ফি বাবদ ১১৫ টাকা আর জামানত ৪০০ টাকা। পরিদর্শকদের কাছে টাকা জমা নেওয়ার রসিদ বই থাকছে। সেখানে গ্রাহকের বাড়িতে বসেই টাকা জমা নিচ্ছেন। এরপর ওয়্যারিং পরিদর্শক ওয়্যারিং যাচাই করে ঠিক আছে জানালেই সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। গোটা প্রক্রিয়া শেষ হতে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট সময় লাগছে। বাড়িতে বসেই বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন এমন একজন হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের শফিকুর রহমান। বললেন, ‘ভোগান্তি ছাড়াই এত অল্প সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া ছিল আমাদের কল্পনারও অতীত। এই কার্যক্রম আমাদের মতো অনেককে সুবিধা দিয়েছে।’

 

কেন এমন উদ্যোগ

শেখ আবদুর রহমান বললেন, ‘আমার এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের সরবরাহও রয়েছে। অথচ অনেকের ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। হরিণাকুণ্ডুতে যোগদান করার পর নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেছি। মানুষের ধারণা ছিল, বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গেলে অনেক টাকা লাগে। দিনের পর বিদ্যুৎ অফিসে ধরনা দিতে হয়; কিন্তু গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুর। এক দিন কাজে না গেলে উপোস থাকতে হয়। এমন পরিবারের পক্ষে দিনের পর দিন অফিসে ধরনা দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া সম্ভব না। তা ছাড়া অনেকে জানেনও না যে কার কাছে যেতে হবে। ফলে দালালের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব দেখে মন খারাপ হতো। তাই এমন উদ্যোগ নিয়েছি।’

শুধু সংযোগের ক্ষেত্রেই নয়, বিদ্যুৎ বিল আদায়েও দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন শেখ আবদুর রহমান। জানালেন, ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় কোনো বিল বকেয়া নেই।

 

এখন সারা দেশে

তাঁর এই উদ্যোগকে এখন মডেল হিসেবে নিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সে অনুযায়ী ৫ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৮০০ ভ্যানে করে চলছে ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ কার্যক্রম। ২০ জানুয়ারি শেখ আবদুর রহমানকে ঢাকায় বিদ্যুৎ ভবনে ডেকে নিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। 

শেখ আবদুর রহমানের জন্ম খুলনার রূপসা উপজেলায়। খুলনার খালিশপুর বঙ্গবাসী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯০ সালে এসএসসি ও খুলনা পলিটেকনিক থেকে ১৯৯৪ সালে ডিপ্লোমা পাস করেন। সহকারী জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে যোগদান করেন ১৯৯৭ সালে। ২০০১ সালে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০১১ সালে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার হন। একই পদে হরিণাকুণ্ডু সাব-জোনাল অফিসে কাজ করছেন ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল থেকে। পেশাজীবনের দায়িত্ব পালনে সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার জন্য একাধিকবার পেয়েছেন বিভাগীয় অ্যাওয়ার্ড। ২০১৪ সালে শরীয়তপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে থাকাকালে ‘সেরা কর্মকর্তা’ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে হয়েছেন ‘সেরা শুদ্ধাচার কর্মকর্তা’।

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা