kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

তোমাদের ভালোবেসে

ধান ধরা মানুষটি

একজন কৃষক তিনি। ধানের জন্য মায়া বড়। হারিয়ে যাওয়া ৩০০ প্রজাতির ধানবীজ সংরক্ষণে রেখেছেন ইউসুফ মোল্লা। এই মানুষটির সঙ্গে দেখা করে এসেছেন টিপু সুলতান

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধান ধরা মানুষটি

রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের দুবইল গ্রামের কৃষক ইউসুফ মোল্লা। বাবার সঙ্গে সকালে ক্ষেতে বেড়িয়ে পরে স্কুলে যেতেন। বাবা আব্দুর রহমান মোল্লার ৪৬ বিঘা জমি ছিল। তখন ১৯৫৫-৫৬ সাল। বাবার ছিল বড় পরিবার। বাবা মারা যাওয়ার পর ইউসুফ ভাগে পেয়েছিলেন সাত বিঘা জমি। তবে ইউসুফ বিয়ে করেছিলেন তার অনেক আগেই। ১৯৬৮ সালে। আর স্কুল ছেড়েছিলেন তারও আগে। অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর আর পড়েননি।

তিন ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম নেয় পর পর। সাত বিঘা নিয়ে দিন পার করতে কষ্টই হচ্ছিল। তখন বছরে ধান মিলত একবারই। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচও ছিল। মহাজনের কাছ থেকে ধার নিতে হতো। জমির ধান উঠলে ১০ টাকা মণ হিসাবে ১০ মণ ধান দিয়ে রেহাই মিলত। একসময় জমিও বিক্রি করতে হচ্ছিল। তবে ধানবীজগুলো আগলে রাখছিলেন। একসময় তাঁর নিজের আর জমি থাকল না। রইল বাকি সাত শতকের বসতভিটা। অভাব কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছিল না। শেষে একই গ্রামের নইমের বাড়িতে মজুর খাটা শুরু করলেন। সেটা ১৯৮৫ সাল। মজুরি হিসেবে পেতেন তিন বেলা ভাত আর মাসে দুই মণ ধান। পরে তিনি এলাকায় এক মসজিদে ইমামতি করতেন। মসজিদের মক্তবে সকালে ছোট ছেলে-মেয়েদের পড়াতেনও। আরেক বেলায় বরেন্দ্রর রাস্তার গাছ পাহারা দিতেন। অভাব পিছু ছাড়ছিল না; কিন্তু ধানভরা জমির স্বপ্ন তাঁর রয়েই গিয়েছিল। একদিন পড়াশোনা শিখে ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে গেল। দুই ছেলে চাকরিও পেল; কিন্তু নিজের তো কোনো জমি নেই। ২০১২ সালে ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে রেজাউল ১০ কাঠা জমি আবাদ করতে দিল। পরের দুই বছর ওই জমিরই বিভিন্ন ভাগে বিভিন্ন জাতের ধান আবাদ করতে থাকলেন। লোকে হাসত। এখন কিন্তু গাঁয়ের লোক তাঁকে আদর্শ কৃষক বলেই জানে। তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলের লুপ্ত ধান, শাকসবজি ও তৈজসপত্রের সংরক্ষক। মোট ৩০০ প্রজাতির ধান তাঁর সংগ্রহে আছে। ইউসুফ মোল্লা গাঁয়ের লোকদের পুঁথি পড়েও শোনান আর কৃষকদের পরামর্শও দেন।

 

দেখো নামের বাহার

ইউসুফ মোল্লার ধানবীজগুলোর মধ্যে আছে—সতিন, রাঁধুনি পাগল, কালিজিরা, পাঙ্গাশ, দাদখানি, বাদশাভোগ, চিনিশংকর, মাগুরশাইল, ঝিঙ্গাশাইল, ভোজনঝুলন, নীলকণ্ঠ, বাসমতী, সোনাকাঠি, দুধসাগর, দলকচু, মধুমালা, ধলেস্বর, গোবিন্দভোগ, কলামুছা, কনকলতা ইত্যাদি। এসব ধানের নাম এখন আর অনেকের মনেও নেই। প্রবীণরাও মনে করতে স্মৃতি হাতড়ান। ইউসুফ মোল্লা পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিলুপ্ত ধানের চাষ অব্যাহত রেখেছেন।

তিনি জৈব বালাইনাশক, জৈব সার প্রস্তুত করে জমিতে প্রয়োগ করেন। তিনি কৃষি উপকরণ যেমন বীজ বা সারের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য কৃষক ইউসুফ মোল্লা ২০১৩ সালে পরিবেশ পদক লাভ করেছেন।

তিনি চান শুধু বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক নয়, পুরো বাংলাদেশের কৃষক এই বিলুপ্ত ধানগুলো চাষ করে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করবে। ৭০ বছর বয়সী এই মানুষটি আজও কর্মচঞ্চল। ধানবীজ সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, ওষধি গাছ লাগিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর পুরনো দিনের কিসসা ও কৃষিচাষের বিভিন্ন বইপত্রের সংগ্রহশালাও রয়েছে।

এ নিয়ে স্থানীয় কৃষক আব্দুল হাবিব ও লিয়াকত আলী জানান, কৃষি সম্পর্কে বিভিন্ন বই তাঁরা ইউসুফ মোল্লার কাছ থেকে নিয়ে গিয়ে পড়েন। পড়া শেষ হলে ফেরত দিয়ে আবার অন্য বই নিয়ে যান। তাঁর বই পড়েও স্থানীয় কৃষকরা বিভিন্ন চাষাবাদ সম্পর্কে ধারণা পান বলে জানান।

ইউসুফ মোল্লা বলেন, ‘সত্যি বলতে কী প্রথম দিকে আমি আমার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা ও উৎসাহ পাইনি। আমার ভাই ও সন্তানরা আমার এই কাজকে অকাজ হিসেবে দেখত। আর এই কাজের পেছনে সময় নষ্ট করায় আমাকে বকাঝকা করত। এখন তারা আমাকে নিয়ে গর্ব করে আর উৎসাহ দেয়। ১৯৭৮ সাল থেকে আমি বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় প্রজাতির ধান ও কৃষি ফসলের বীজ সংরক্ষণ করে আসছি। কৃষিকাজে কখনো রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করিনি। আমি নিজেই কম্পোস্ট সার ও জৈব বালাইনাশক তৈরি করে জমিতে প্রয়োগ করি।’

তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁর সংগ্রহের ধানবীজগুলো সারা দেশেরই সম্পদ।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা