kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশ্ববিচিত্রা

ভাড়াটে যোদ্ধা

সশস্ত্র সৈনিক তারা। তবে কোনো দেশের নয় বা কোনো আদর্শের সৈনিকও নয় তারা। যে বেতন দেয় তার প্রতিই তাদের আনুগত্য। তারা ভাড়াটে যোদ্ধা। আহমেদ বায়েজীদ তাদের খবর বলছেন

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাড়াটে যোদ্ধা

অর্থের বিনিময়ে তারা যেকোনো দেশ বা সংস্থার হয়ে যুদ্ধ করে। ভাড়াটে যোদ্ধা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় নিরাপত্তা ঠিকাদার বা সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টর। নিজস্ব সৈনিকদের প্রাণহানি এড়াতে অনেক দেশই  ভাড়াটে যোদ্ধা ব্যবহার করছে।

 

দি একাডেমি

বেসরকারি ও সামরিক অনেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আছে বিশ্বজুড়ে। সামরিক প্রশিক্ষণ আছে কিংবা অস্ত্র চালাতে জানে এমন লোকদের সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠানগুলো।  কখনো বা প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজেরাই যোদ্ধা তৈরি করে। মাসিক, বার্ষিক বেতন কিংবা অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক পারিশ্রমিকে নিয়োগ করা হয় এই যোদ্ধাদের। বিশ্বের একটি নামি সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টর যুক্তরাষ্ট্রের ‘একাডেমি’। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ব্ল্যাকওয়াটার’। মার্কিন নেভি-সিল ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা এরিক প্রিন্স এর প্রতিষ্ঠাতা। উত্তর ক্যারোলাইনায় সাত হাজার একর জায়গায় একাডেমির প্রশিক্ষণকেন্দ্র। ২০০৭ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, একাডেমির সৈনিক সংখ্যা ২০ হাজার। এয়ারক্রাফট আছে ২০টি, আছে অনেক যোদ্ধা কুকুর। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আফগান ও ইরাক যুদ্ধে লড়েছে একাডেমির সৈনিকরা। জাপানের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমও রক্ষণাবেক্ষণ করে একাডেমি। বিশ্বজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযানে এর সৈনিকরা অংশ নিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের ইন্টারন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সও বেশ নামকরা সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টর। ২০০৩ সালে বাগদাদে আটকে পড়া ছয়জন ব্রিটিশ আইনজীবীকে অক্ষত উদ্ধার করে আলোচনায় এসেছিল প্রতিষ্ঠানটি। রাশিয়ার স্লাভোনিক কর্প আর যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারস্ক্যানও এখনকার আলোচিত নিরাপত্তা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সিরিয়া, লিবিয়া, ইউক্রেন আর ইয়েমেন যুদ্ধেও সক্রিয় আছে সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টররা। 

 

আগের কথা

ভাড়াটে সৈনিকদের ইতিহাস অনেক পুরনো। কেউ কেউ বলেন, এটি দ্বিতীয় প্রাচীন পেশা। সব শাসকই নিজেদের নিয়মিত সৈনিকদের বাইরেও ভাড়াটে যোদ্ধা ব্যবহার করতেন। পিটার ডাব্লিউ সিঙ্গারের করপোরেট ওয়ারিয়র্স বইতে আছে, ‘প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর রাষ্ট্রের সুমেরীয় রাজা শুলঘি (খ্রিস্টপূর্ব ২০৯৪-২০৪৭) ভাড়াটে সৈন্যদের কাজে লাগান। পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের বিখ্যাত সুইস গার্ড বাহিনীতেও ভাড়াটে সৈন্য ছিল। আধুনিককালের ভাড়াটে যোদ্ধারা এসেছে ব্রিটিশদের হাত ধরে। ১৯৬৫ সালে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর এক দল সাবেক কর্মকর্তা গড়ে তোলেন ওয়াচগার্ড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এটি সত্তরের দশকে লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফিকে উত্খাতের ব্যর্থ চেষ্টাসহ অনেক ঘটনার সঙ্গে জড়িত।

এরপর স্নায়ুযুদ্ধের আমলে সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সামরিক বিশেষজ্ঞ শন ম্যাকফেট তাঁর বিখ্যাত বই দ্য মডার্ন মার্সেনারিতে বলছেন, ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বিশ্বে নিরাপত্তা ঠিকাদারের সংখ্যা আগের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। মূলত যুদ্ধের কৌশল বদলে যাওয়ায় এমনটি ঘটছে।

কারা ক্লায়েন্ট

বিভিন্ন দেশের সরকার ও তাদের বিভিন্ন সংস্থা ভাড়াটে সৈনিকদের বেশি কাজে লাগায়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সরকার ও তাদের বিভিন্ন সংস্থা নিরাপত্তা ঠিকাদারদের প্রধান ক্লায়েন্ট। দুটি বিশ্বযুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে সৈন্যদের মৃত্যুর হার দেখেই বিকল্প সৈন্যদের বেছে নিচ্ছে রাষ্ট্রগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের ১০ শতাংশ ছিল ভাড়াটে; কিন্তু ইরাক ও আফগান যুদ্ধে এই সংখ্যা বেড়েছে অন্তত পাঁচ গুণ। বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই ভাড়াটে সৈন্যদের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে এদের ছাড়া কোনো যুদ্ধের কথা চিন্তাও করে না।

ইয়েমেন যুদ্ধেও বিপুলসংখ্যক ভাড়াটে সৈন্য ব্যবহৃত হচ্ছে; এমনকি জাতিসংঘও তাদের কিছু কাজে ভাড়াটে সৈন্য ব্যবহার করে। গিনির সরকার উচ্ছেদে ব্রিটিশদের সৈন্য ভাড়া করা নিয়ে বহু কথাবার্তা হয়েছে। শন ম্যাকফেটের আশঙ্কা, আগামী দিনে যুদ্ধের সবচেয়ে সহজলভ্য ও বড় উপকরণ হয়ে উঠতে পারে ভাড়াটে সৈন্যরা।

 

আর্থিক সমীকরণ

ভাড়াটে যোদ্ধা পেশাটির সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহের সম্পর্ক যতটা ততটাই সম্পর্ক অর্থের। সংঘাত আর যুদ্ধ যত বাড়ে, ততই মুনাফা বাড়ে নিরাপত্তা ঠিকাদার কম্পানিগুলোর। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এই খাতে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে বলেন ‘যুদ্ধের ব্যবসায়’। শুধু ২০১৭ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন তাদের ঠিকাদারদের দিয়েছে ৩২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

অভিযোগ আছে, মুনাফার জন্য এই ঠিকাদারি কম্পানিগুলো যুদ্ধ বাধিয়ে রাখে। ‘একাডেমি’র প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, ‘সৈন্যরা নয়, ঠিকাদাররাই আফগানিস্তানে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখবে।’ ম্যাকফেট এক নিবন্ধে লিখেছে, ‘ভাড়াটে সৈন্যরা তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য যুদ্ধ আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে, তারা যুদ্ধকে সমাপ্তিহীন করে তুলতে পারে।’

ভাড়াটে সৈন্যদের বিষয়ে জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং কমিটির প্রধান হোসে এল গোমেজ ডেল পারডো তাঁর রিপোর্টে বলেছিলেন, বেসরকারি সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো চায় মুনাফা। যেটি জন্ম দিতে পারে বিপজ্জনক ও ভয়াবহ পরিস্থিতির।

 

সহিংসতা বিতর্ক

ভাড়াটে যোদ্ধাদের হাতেই বেশি সহিংসতা হয় বলে অভিযোগ আছে। হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। মার্কিন কংগ্রেসের এক নথিতে বলা হয়েছে, ‘একাডেমি’র সদস্যরা ২০০৫ সাল  থেকে অন্তত ২০০ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ২০০৭ সালে তারা ইরাকের একটি মার্কেটে গুলি চালিয়ে ১৪ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। এল-৩ নামের আরেক মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা কুখ্যাত আবু গারিব কারাগারে বন্দি নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিগ্রহে ভাড়াটে সৈনিকদের পা পড়ার কারণে তা ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে এবং সংঘাতকে আরো প্রাণঘাতী ও দীর্ঘতর করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা