kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশাল বাংলা

হাওরের হাসি

মহাজনের কাছ থেকে সুদে ঋণ এনে, ভাঁড়ারের ধান ও গবাদি পশু বিক্রি করে হাওরের মানুষ স্বপ্ন বুনছে এখন। আশা করছে মাঠ ভরে ধান হাসবে। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে গিয়েছিলেন শামস শামীম

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাওরের হাসি

ভাটির দেশের কথা

হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রমতে, ৪১৪টি এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪২৩টি হাওর রয়েছে দেশে। এসব হাওরের সম্মিলিত আয়তন প্রায় আট হাজার বর্গকিলোমিটার। এগুলো সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৪৮টি উপজেলায় বিস্তৃত। শুধু সুনামগঞ্জেই আছে ৯৫টি হাওর। দেশের মোট আয়তনের ছয় ভাগের এক ভাগ জুড়ে এই হাওরাঞ্চলে প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। ২০১৭ সালে হাওরের সব ফসল তলিয়ে গিয়েছিল। ধানের সঙ্গে মরেছিল হাওরের মিঠাপানির সুস্বাদু মাছও। তবে ২০১৮ সালে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন হয়েছিল। এবার দুই লাখ ১৫ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমি ফসল চাষের আওতায় আনা হচ্ছে। পুরো জানুয়ারি জুড়েই হাওরে ধান লাগানোর উৎসব চলবে। ছেলে-বুড়ো সবাই হাওরের হাসি দেখার স্বপ্নে বিভোর।

 

লোড়া বিলে জোছনা

সুনামগঞ্জের অন্যতম বড় হাওর দেখার হাওর। কথায় আছে, এই হাওরের ফসলে পুরো বাংলাদেশের মানুষ দুদিন খেতে পারে। শুক্রবার সকাল ৮টায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। শীতের সূর্য তখনো লেপতলায় ছিল। লোড়া বিল কান্দায় হালুয়ারগাঁও গ্রামের বিধবা কিষানি জোছনা বেগমের বয়স ৫০। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছেলে আব্দুল কবির ও বড় ভাই আজিজুর রহমান তাঁর সঙ্গী আছেন। বিআর-২৯ প্রজাতির বোরো ধানের বীজগাছ একটা ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে জমিতে চলেছেন। তাঁর জমি সাকল্যে ৯০ শতক। এই জমির ফসল থেকেই তাঁদের সারা বছরের খোরাকি। খরচ হয় সাত-আট হাজার টাকা। হাওর হাসলে ৪০-৫০ মণ ধান পান। জোছনা বললেন, বীজতলা তৈরি, বীজগাছ উত্তোলন, বীজচারা ক্ষেতে নিয়ে যাওয়া, ধান রোপণ, সার ও কীটনাশক ব্যবহার, ধান কাটানো, বাড়িতে নিয়ে যাওয়াসহ সব কাজই নিজেরা করেন। শ্রমিক এক-দুজন সঙ্গে থাকে।

 

তেরাছাবই

দেখার হাওরের বাহাদুরপুর গ্রামসংলগ্ন অংশটি তেরাছাবই নামে পরিচিত। কালা মিয়ার বাড়ি এখানে। জমি তাঁর নেই বললেই চলে। ৩৫০ টাকা রোজে মজুরি খাটতে যান হাওরে। বাড়ির সামনে তাঁর ৪০ শতক জমিতে দেখলাম তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে ধান রোপণ করছে। কাছের এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন মা মিনারা বেগম। মিনারা বললেন, ‘বোরো মৌসুমে হাওরের স্কুলগুলো বন্ধই থাকে। ছেলে-মেয়েরা এ সময় পরিবারকে সাহায্য করে। আমাদের ছেলে-মেয়েরা ছোটকালেই কৃষিকাজ শিখে ফেলে।’ পানিতে ফসল ডুবে যাওয়ার ভয় প্রতিবারই থাকে মিনারাদের। তাই বলে দমে যান না। প্রতিবারই নতুন মৌসুমে ধান বুনতে লেগে যান।

বাগলাধরা

হাওরের গোবিন্দপুর কান্দার অংশটি বাগলাধরা নামে পরিচিত। এখানে কলেজপড়ুয়া ছোট ভাই জাহাঙ্গীর ও একজন শ্রমিক নিয়ে বিআর-২৯ ধান লাগাচ্ছেন কৃষক নূরুল আমীন। হাওরে তাঁর প্রায় ৯০ একর জমি রয়েছে। আটজনের পরিবার এই কৃষিজমির ফসলের ওপরই নির্ভরশীল। গত বছর প্রায় ১৫০ মণ ধান পেয়েছেন তিনি। কিছু ধান বিক্রি করতে পেরেছিলেন। এবারও স্বপ্ন দেখছেন পুরো ফসল গোলায় তোলার। নূরুল আমিন এ বছর বিআর ২৮, ২৯-এর সঙ্গে কিছু জমিতে দেশি বোরোর চারাও লাগাচ্ছেন। ফলন কম হয়, তবে এই ধান সুস্বাদু। তাই হাওরের কৃষকরা সাধ করে লাগান।

 

খরচ বাড়ছে কিন্তু

কৃষকরা জানালেন, প্রতিবছরই খরচ বাড়ছে। গেলবার ধানের দামও বেশি ওঠেনি। উৎপাদন খরচের সমান সমান বলা চলে। কাটার মৌসুমে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তার ওপর বজ্রপাতের কারণে শ্রমিকরাও ভয়ে ধান কাটতে চায় না। উল্লেখ্য, প্রতিবছরই অনেক মানুষ হাওরের ক্ষেতে মারা যান বজ্রাঘাতে। কৃষকরা সরকারি খরচে বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকার বজ্রপাত মোকাবেলায় তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা করছে; কিন্তু এলাকাবাসী এ ব্যাপারে একমত হতে পারছে না। তাদের মতে, হাওরের নিচু জমিতে তালগাছ বাঁচবে না। বন্যায় মরে যাবে। আর তালগাছ বড় হতেও ৩০ বছর লাগে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা