kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বৈঠকখানা

আজ তবে ঘুড়ির গল্প বলি

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আজ তবে ঘুড়ির গল্প বলি

১৪ ও ১৫ জানুয়ারি পুরান ঢাকায় হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব। অনেকের কাছে এটি ঘুড়ি উৎসব নামেও পরিচিত। কারণ ঘুড়ি ওড়ানো এই উৎসবের অংশ হয়ে আছে। তবে ঘুড়ির ইতিহাস কিন্তু অনেক প্রাচীন। কাহিনিটা এ রকম—কোনো এক ঝড়ের দিনে একজন কৃষক বিপাকে পড়েছিলেন। বাতাসে উড়ে যেতে চাইছিল তাঁর মাথালটি। তখন একটি রশি দিয়ে তিনি মাথালটি শক্ত করে বাঁধলেন। রশির গোড়া রাখলেন ডান হাতে; কিন্তু এমনই ঝড় যে মাথালটিকে মাথায় থাকতে দিচ্ছিল না। রশির আগায় চড়ে উড়ছিল ক্ষণে ক্ষণে। পৃথিবীর প্রথম ঘুড়ি নাকি সেটাই। আরিবা রেজা এরপরের খবরও জানতে চেয়েছিলেন

 

প্রথম ঘুড়ির বয়স তিন হাজার বছর হতে পারে। কৃষকটি কিন্তু চীন দেশের ছিলেন। মাথাল ঘুড়ির ব্যাপারটি লোকগাথা পড়ে জেনেছেন গবেষকরা। নিশ্চিত হয়েছেন হান রাজবংশের জেনারেল হান শিনের ঘুড়ির ব্যাপারে। হান শিন একবার একটি শহর দখলে আনতে চাইছিলেন। যেখানে নিজের সেনাবাহিনী জড়ো করেছিলেন, সেখান থেকে শহরের প্রকৃত দূরত্ব জানা তাঁর দরকার হয়ে পড়েছিল। কারণ তিনি একটি সুড়ঙ্গ খুঁড়তে চাইছিলেন। তখন ঘুড়ি উড়িয়ে শহরের মাথায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর সুতার মাপে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে শহরটি জয় করেছিলেন। এটা খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের ঘটনা। প্রাচীনকালে বাতাসের গতি মাপার জন্য এবং সংকেত পাঠানোর জন্য ঘুড়ির ব্যবহার ছিল। চীনা ঘুড়িগুলোয় পুরাকাহিনির চিত্র আঁকা থাকত। ঘুড়ি তারপর চীন থেকে গেছে কোরিয়ায়। সেখানেও একটি যুদ্ধের ঘটনা আছে। ৬০০ সালের কথা। সিলা রাজবংশের জেনারেল গিম ইউ সিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একটি বিদ্রোহ দমনের জন্য; কিন্তু তাঁর সৈন্যরা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ আকাশ থেকে তারা খসে পড়তে দেখেছিল, যা তাদের দৃষ্টিতে ছিল অশুভ। পরে জেনারেল বুদ্ধি করে একটি ঘুড়িকে বাহন করে আকাশে আগুনের গোলা (ফায়ার বল) পাঠিয়েছিলেন। সৈন্যরা ভাবল, তারা স্বর্গে ফিরছে। তাই আবার যুদ্ধে ফিরে আসতে সম্মত হয়েছিল। জাপানে ঘুড়ি নিয়ে গিয়েছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। সেটা সপ্তম শতক। লোকে বিশ্বাস করত, ভিক্ষুরা ঘুড়িতে চড়িয়ে অশুভ আত্মাকে দূরে সরিয়ে দেয়; তাই ফসল ভালো হয়। জাপানে পরে ঘুড়ি ওড়ানো এতই জনপ্রিয় হয় যে লোকেরা কাজে যেতে চাইত না। তাই সরকারকে ফরমান জারি করতে হয়েছিল। ৯০৬ অব্দে রাশিয়ার রাজপুত্র নভগরদের ওলেগ কনস্টান্টিনোপল দখল নিতে চেয়ে ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন। এখনো কিন্তু ফিলিস্তিনের ছেলেরা ঘুড়িতে করে আগুনবোমা পাঠায় ইসরায়েলিদের সেনাচৌকিতে।

মোগল ভারতের মিনিয়েচার চিত্রকলায় ঘুড়ি ওড়ানোর নমুনা দেখা যায়। ১৫ শতকের কথা এটি। সে আমলে ঘুড়ি ভালোবাসার কথা বয়ে বেড়াত। বিষয়টি এমন—প্রেমিকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে প্রেমিকাকে। বিরহী প্রেমিক ঘুড়ি পাঠিয়ে জানান দিত—ভুলিনি তোমায়। মকর সংক্রান্তিতে (জানুয়ারির মাঝামাঝি) ভারতে ঘুড়ি কাটাকাটির বিরাট উৎসব হয়; বিশেষ করে ভারতের গুজরাট, বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান আর পাঞ্জাব একদিক থেকে ঘুড়িরই রাজ্য। ভারতে প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস আর বিশ্বকর্মা পূজার দিনও অনেক ঘুড়ি ওড়ে। পৌষের শেষে ঢাকায়ও ঘুড়ি উৎসব হয়। সাকরাইন নামে পরিচিত এ উৎসব ঢাকার অন্যতম পুরনো উৎসব। উল্লেখ্য, নাবিকরা মালয়েশিয়ায় ঘুড়ি নিয়ে গিয়েছিল জাপান থেকে ষোলো বা সতেরো শতকে। মালয়েশিয়ার মালাক্কায় একটি ঘুড়ি জাদুঘরও আছে।

 

মাছের জন্য ঘুড়ি টোপ

প্রশান্ত মহাসাগরের ৬০০ দ্বীপের দেশ মাইক্রোনেশিয়ার লোক ঘুড়িতে করে গার মাছের জন্য টোপ পাঠাত। মাছটি স্থলভাগ থেকে কিছু বেশি দূরেই থাকে। আগের দিনের সিঙ্গাপুরেও মাছ ধরার জন্য ঘুড়ির ব্যবহার ছিল। এদিকে পলিনেশিয়ার লোকে বলে বেড়ায় তাদের দুই দেবতার মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানোর লড়াই হয়েছিল। যে জিতেছিল তার ঘুড়ি পৌঁছে গিয়েছিল দূরতম আকাশে। সে উপলক্ষে পলিনেশিয়ায় বিরাট ঘুড়ি উৎসব হয় ফিবছর।

 

মার্কো পোলো নিয়ে গেলেন

ইউরোপে ঘুড়ির গল্প নিয়ে গিয়েছিলেন মার্কো পোলো ১৩ শতকে। তবে ইউরোপিয়ানরা ঘুড়ি খেলায় বেশি মজা পায়নি। আমেরিকানরা ঘুড়িকে বিজ্ঞান গবেষণার হাতিয়ার বানিয়েছিল। ১৭৫২ সালে বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন ঘুড়ি উড়িয়ে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছিলেন। বিমান আবিষ্কারের প্রস্তুতি পর্বে রাইট ভাইয়েরাও ঘুড়ি উড়িয়ে দেখেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ, ফরাসি, ইতালীয় বা রাশিয়ান সেনারা শত্রুপক্ষের অবস্থান জানার জন্য ঘুড়ি উড়িয়েছে অনেক।

ঘুড়ি দেশে দেশে

পোকা, প্রাণী বা পাখির সুরতে ঘুড়ি বানাতে ভালোবাসে চীনারা। মাঝখানে বাঁশের দণ্ড রেখে সিল্ক কাপড়ের ঘুড়ি বানায় তারা। আফগানরাও ঘুড়িপ্রিয় জাতি। পাকিস্তানিরা ঘুড়ি বাজি করতে পছন্দ করে। বসন্ত উৎসবে লাহোরিরা বেশি ঘুড়ি ওড়ায়। ইন্দোনেশিয়ার আকাশেও অনেক ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়, বিশেষ করে বালির আকাশে। প্রজাপতি, ড্রাগন ইত্যাদির চেহারায় ঘুড়ি বানায় বালিনিজরা। ভিয়েতনামের ঘুড়িগুলোর লেজ থাকে না; বরং লেজের জায়গায় একটি ছোট্ট বাঁশি লটকে দেয়। সেটি বাতাসে মধুর শব্দ তৈরি করে। দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিলের শিশুরা ঘুড়ি খুব পছন্দ করে। সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ চিলিতে স্বাধীনতা দিবসে প্রচুর ঘুড়ি ওড়ে। পেরুর লোকও ঘুড়ি পছন্দ করে। ইস্টারে গায়ানায় ঘুড়ি ওড়ানো হয়। শেষমেশ খালেদ হোসাইনির কাইট রানারের কথা বলতে হয়। তিনি ওই নামে একটি উপন্যাস লিখেন ২০০৩ সালে। ২০০৭ সালে এ বই থেকে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়। চলচ্চিত্রটিও দারুণ আলোচিত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা