kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১         

বিজয়ী

সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার হয়েছেন কে এম আসাদ। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি এ পুরস্কার পেলেন। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিজয়ী

পুরো নাম খোন্দকার মোহাম্মাদ আসাদ। কে এম আসাদ নামেই চেনে লোকে। এএফপি, জুমা প্রেস ও গেটি ইমেজের হয়ে কাজ করেন। ক্যামেরায় ধরে রাখেন মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার গল্প। আসাদের ছবি তোলা শুরু ১৯৯৮ সালে। সেইবার তিনি এসএসসি পাস করেছিলেন সবে। বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন একটি ইয়াশিকা ক্যামেরা। তারপর বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস) থেকে করলেন বেসিক কোর্স। ২০০৫ সালে যান পাঠশালায়। আলোকচিত্রে তিন বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স করেন। ২০০৫ সালেই কিনেছিলেন ভিভিটর ৩৮০০ ক্যামেরা। ডিজিটাল ক্যামেরা হাতে নেন ২০০৭ সালে। সেটি ছিল ক্যানন ৩৫০ডি। এখনো ক্যানন ক্যামেরায়ই ছবি তোলেন।

রোহিঙ্গাদের ছবি তুলছেন ২০১২ সাল থেকে। শুধু রোহিঙ্গাদের ছবি তুলেই পেয়েছেন কুড়িটির মতো পুরস্কার। এসবের মধ্যে ইউনিসেফ ফটো অব দ্য ইয়ার ২০১৭, হিপা অ্যাওয়ার্ড উল্লেখযোগ্য। আর গেল সপ্তাহে হলেন সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার। যে ছবিটির জন্য পেলেন এ সম্মান, সেটিতে এক স্বজনহারা রোহিঙ্গা শিশুকে কাঁদতে দেখা যাচ্ছে। গত এক বছরে ছবিটি রোহিঙ্গা সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আসাদ চান রোহিঙ্গা সংকটে তোলা ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী ও একটি বই প্রকাশ করতে। উল্লেখ্য, মধ্য ইতালির একটি ঐতিহাসিক শহর সিয়েনা। ইউনেসকো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে ২০১৫ সাল থেকে।

অমূল্য রতন

ছবিটির শিরোনাম ব্যাটেল ভিকটিম বা যুদ্ধের শিকার। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখ ছিল সেদিন। ভোর ৫টায় ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন আসাদ। ছবি তুলতে তুলতে উখিয়ার কাছাকাছি আঞ্জুমান আরা বর্ডারের কাছে চলে যান। সকাল ১১টায় ছিলেন কুতুপালং ক্যাম্পের সামনের রাস্তায়। হঠাৎ খেয়াল করলেন, সামনে একটা বড় জটলা। ‘প্রায় ২০০ মানুষ। বেশির ভাগই নারী ও শিশু। দুই-একজনের সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটি বোঝার চেষ্টা করলাম। জানলাম, তারা আগের রাতেই বাংলাদেশে ঢুকেছে। পথঘাট কিছু চেনা নেই। ছবিতে যে মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে, তার নাম আসমত আরা। একটা গাছে মাথাটা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ডান হাত দিয়ে ধরেছিল গাছটি। বয়স ১১-১২ বছর হবে। পরনে হাফপ্যান্ট। চুল উষ্কখুষ্ক। চোখে-মুখে আতঙ্ক। মেয়েটিকে দেখে মায়া লাগল। কথা বলার চেষ্টা করলাম; কিন্তু ও বাংলা মোটেও বোঝে না। কাছের একজন বলল, মেয়েটি স্বজনদের খুঁজে পাচ্ছে না। ১০ মিনিট ধরে মেয়েটির ছবি তুললাম। ১০০ মতো ক্লিক। একসময় দেখলাম মেয়েটি কাঁদছে। আমি আরো কিছু ছবি তুললাম। তারপর সন্ধ্যায় কক্সবাজার হোটেলে ফিরলাম। একটু ফ্রেশ হয়ে ছবি দেখতে বসলাম। বাছাই করে এজেন্সিতে (এএফপি) পাঠাতে থাকলাম। কিন্তু এই ছবিটি নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম—ছাড়ব কী, ছাড়ব না। শেষ পর্যন্ত ছেড়েই দিলাম। সকাল হতে না হতেই ফোন আসতে শুরু করল। অভিনন্দন জানাল অনেকে। কাছের এক বাজারে গিয়ে দেখি, আমাদের একটা দৈনিকেও প্রথম পৃষ্ঠায় ছবিটি বড় করে ছাপা হয়েছে। দুপুরে এএফপির ভিডিও টিমের একজন এলেন। বললেন, ‘তোমার ছবিটা তো সারা বিশ্বেই  সাড়া ফেলেছে। ইনস্টাগ্রামেও অনেক শেয়ার হচ্ছে। ছবিটা প্রকাশের পর অং সান সুচির ওপর চাপ বেড়েছিল।’ বলছিলেন আসাদ।

 

ছবিটি এএফপি থেকে নিয়ে গার্ডিয়ান, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরাও প্রকাশ করেছিল। গার্ডিয়ানে  ছবিটি পিকচার অব দ্য ডে, পিকচার অব দ্য উইক এবং পরে পিকচার অব দ্য ইয়ার হয়েছিল। এএফপিও ছবিটি পিকচার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত করেছিল।

সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ড ২০১৮ সালে ছবি জমা নেওয়া শুরু হয়েছিল জানুয়ারি মাসে। এবার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট আটটি ছবি জমা দিয়েছিলেন। মার্চের দিকে জানতে পারেন, প্রতিযোগিতায় তিনটি ছবি মনোনীত হয়েছে। এপ্রিলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র পেলেন আসাদ। অক্টোবরের ২৫ তারিখে বিমানে চড়লেন। ২৭ অক্টোবর ছিল ফাইনাল। সেখানে আসাদকে সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার পুরস্কার তুলে দিলেন বিচারকরা। সারা বিশ্ব থেকে প্রায় ৪৮ হাজার ছবি জমা পড়েছিল এ প্রতিযোগিতায়। আসাদের ছবিটি পেয়েছিল ১৫ হাজারের বেশি ভোট। জুরি বোর্ডের সদস্য ছিলেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী র্যান্ডি ওলসন। আসাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় তিনি বলেছেন, ‘দিস ইজ আ প্রাইসলেস ফটো। এটি অমূল্য রতন।’ ২৮ অক্টোবর বিজয়ী ছবিগুলো নিয়ে একটি প্রদর্শনীও হলো ইতালির সিয়েনায়।

আসাদের এখন একটাই দুঃখ সেই আসমত আরার আর দেখা পাননি। ছবিটা প্রকাশের পর অনেক দিন খুঁজেছেন। বললেন, শিগগিরই আবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাব। আবার খুঁজব। ওর জন্য কিছু করার চেষ্টা করব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা