kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

সূত্রধর

হর্ষচরিত

৬ মে, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হর্ষচরিত

শ্রীহর্ষবর্ধন ছিলেন পুষ্পভূতি রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। রাজত্ব করেছেন ৬০৬ থেকে ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তাঁর সভাকবি বাণভট্ট লিখে গেছেন হর্ষচরিত। গবেষকরা প্রাচীন ভারত সম্পর্কে অনেক তথ্য খুঁজে পান হর্ষচরিতে। এম রেয়াজুল হক বলছেন আরো অনেকটা

গুপ্ত রাজবংশের (৩২০-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) পতনের পর উত্তর ভারত খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়। হর্ষবর্ধনের বাবা প্রভাকরবর্ধন হুনদের পরাস্ত করে থানেশ্বরের (এখনকার হরিয়ানা) রাজা হন। হর্ষবর্ধন (৫৯০-৬৪৭) তাঁর ছোট পুত্র। হর্ষবর্ধনের বড় ভাই রাজ্যবর্ধন থানেশ্বরের রাজা ছিলেন। রাজ্যবর্ধন বোন রাজ্যশ্রীকে বিয়ে দিয়েছিলেন মাউখারি রাজ গ্রহবর্মণের কাছে। কিছুকাল পরে মালবের রাজা গ্রহবর্মণকে পরাজিত করেন এবং হত্যা করেন। গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক নাকি চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বন্ধুত্বের সুযোগে প্রতারণা করেছিলেন। পরে মালবের রাজার সঙ্গে আতাত করে হত্যা করেছিলেন রাজ্যবর্ধনকেও। হর্ষবর্ধন ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে গৌড়াভিমুখে যাত্রা করেন এবং শশাঙ্ককে হত্যা করেন। হর্ষবর্ধন সিংহাসনে বসেছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে।

 

হর্ষের রাজ্যপাট

হর্ষ জাতিতে ছিলেন বৈশ্য। গোড়ায় ছিলেন শিবের উপাসক। পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। পাঞ্জাব থেকে উত্তর ভারত ছুঁয়ে মধ্য ভারত পর্যন্ত তিনি সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন। দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন নর্মদা নদীর তীর পর্যন্ত। পূর্ব দিকে কামরুপ রাজ্যের সীমানাও ছুঁয়েছিলেন। প্রজারা তাঁর আমলে সুখে-শান্তিতে ছিল। তাঁর দরবারে লেখক-শিল্পীরা সম্মান পেয়েছেন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তাঁর আতিথ্য নিয়েছিলেন। বলে গেছেন, হর্ষবর্ধন ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। কনৌজ ছিল তাঁর রাজধানী। তাঁর উপাধি ছিল পরম মাহেশ্বর রাজচক্রবর্তী। তাঁর সভাকবি বাণভট্ট কাদম্বরী নামের আরেকটি বই লিখেছেন। হর্ষ তাঁর রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সরাইখানা নির্মাণ করেছিলেন। প্রতি পাঁচ বছরে তিনি তাঁর রাজধানী কনৌজে একটি বৃহৎ ধর্মসভার আয়োজন করতেন। ধর্মসভা বসাতেন প্রয়াগেও। 

 

হর্ষের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গুপ্ত আমলে; কিন্তু এর সমৃদ্ধি তৈরি হয় হর্ষবর্ধনের আমলে। হর্ষরাজা নালন্দার ছাত্রদের থাকা, খাওয়া ও পড়ালেখার সুব্যবস্থা করেছিলেন। কাউকেই কোনো কিছুর জন্য অর্থ গুনতে হতো না। ১০০টি গ্রামের কর পাওয়ার বন্দোবস্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে করে দিয়েছিলেন হর্ষবর্ধন। 

 

এবার হর্ষচরিত

অলংকারবহুল পদ্যে রচিত হর্ষচরিত। সংস্কৃতে লেখা প্রথম জীবনীগ্রন্থের পালক এ বইয়ের মুকুটে। বইটি ইংরেজিতে অনূদিত হয় ১৮৯৭ সালে। এতে বাণ গ্রামীণ ভারতের বিশেষ করে প্রকৃতির বর্ণনাও দিয়েছেন ব্যাপক। বলেছেন হর্ষরাজের প্রজাদের পেশা ও দক্ষতা নিয়েও। রাজার আনুকূল্য পেয়েও তিনি বিরক্তিকর রাজপ্রশংসা করেননি। তবে রাজার প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব ছিল। হর্ষচরিতের কথাবার্তা এমন—‘আমাদের তো চিরদিনই অল্পেই তুষ্টি। বিদ্যাবিনোদের সন্নিধানে আমরা সর্বদা বাড়ছি, সহায় আমাদের একমাত্র বৈতানবহ্নি (যজ্ঞের অগ্নি)। আমাদের অভাব তো কিছুই নেই। আর সুখের অভাব কোথায়, যখন শেষনাগের দীর্ঘদেহের মতো বিশাল বাহু নিয়ে পৃথিবী রক্ষা করছে পৃথ্বীপতি দেবহর্ষ।’ আটটি অধ্যায় রয়েছে বইটির। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাণ নিজের বংশগৌরব ও  শৈশবের কথা বলেছেন। 

 

প্রথম অধ্যায় : বাৎসায়ন-বংশ-বর্ণনং

বাত্স্যগোত্রীয় চিত্রভানু ও রাজদেবীর পুত্র বাণ। অতি বাল্যকালে মা মারা যান। ১৪ বছর বয়সে পিতাকেও হারান। পিতার মৃত্যুর পর কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েছিলেন। এরপর বহু দিন বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। ভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মিশেছেন।

 

দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায় : রাজদর্শনং

গ্রীষ্মের একদিন। রাজা হর্ষবর্ধনের রাজসভায় বাণের ডাক পড়ে। রাজার দূত কৃষ্ণ তাঁকে পত্র দিয়ে ডেকে পাঠান। তাঁকে দেখে রাজা হাস্যপরিহাস করেন। উপহাসও।  কিন্তু পরে কৃষ্ণের সহায়তায় রাজসভায় সাদরে গৃহীত হন তিনি এবং দ্রুতই রাজার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। রাজা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন : ‘তার সমৃদ্ধিসম্ভার শত শত মহাভারতেরও অকথনীয়।’ 

প্রথম রাজদর্শনের অভিজ্ঞতা  লিখেছেন বাণ, ‘মণ্ডপের পুরোভাগে অঙ্গনখানিকে উজ্জ্বল করে রাজমান (উপবিষ্ট) ছিলেন মহারাজচক্রবর্তী শ্রীহর্ষদেব,

যিনি ধর্মের আবর্তন, সৌভাগ্যের পরমপ্রমাণ,

যিনি রূপাণু-সৃষ্টির পূর্ণ সমাপ্তি,

যিনি পরাক্রমের খনি-পর্বত, কান্তির কথাবসান,

যিনি করুণার একাগার,

যিনি গম্ভীর, প্রসন্ন, ত্রাসজনন (ভয় সঞ্চার), কৌতুকজনন এবং পুণ্যবান।’

আর রাজা তাঁকে দেখেই—

‘গিরিগুহাগত সিংহের গর্জনের মতো গম্ভীর স্বরে আকাশ পূর্ণ করে জিজ্ঞাসা করলেন—

এই কি সেই বাণ?

এখনো এঁর ওপর প্রসাদ দেখাইনি। এঁর দিকে চোখ ফেরাব না। ইনি একটি মহাভূজঙ্গ।’

 

চতুর্থ অধ্যায় : চক্রবর্তিজন্মবর্ণনং

নরপতি পুষ্পভূতির ঔরসে সূচনা হয় এক রাজবংশের। রাজাধিরাজ প্রভাকরবর্ধনের জন্ম হয় এই রাজবংশে। প্রভাকরবর্ধনের ঘরে জন্ম হয় দুই পুত্র—রাজ্যবর্ধন ও হর্ষবর্ধন এবং এক কন্যা রাজ্যশ্রীর। তাঁদের জন্মের আগেই মহাদেবী যশোবতী স্বপ্ন দেখলেন, ভগবান সূর্যদেবের মণ্ডল থেকে নির্গত হয়ে আসছে ছোট্ট ছোট্ট দুই কুমার ও তাদের পেছনে পেছনে আসছে সুষুম্নারশ্মি (সূর্যরশ্মি বিশেষ) থেকে বেরিয়ে আসা চন্দ্রমূর্তির মতো দেখতে একটি ছোট্ট মেয়ে। কুমাররা তেজের যেন পিণ্ড। তাদের দুজনেরই মাথায় মুকুট, কানে কুণ্ডল, হাতে অঙ্গদ, বক্ষে কবচ, তারা অস্ত্রধারী।

জ্যৈষ্ঠ মাস। কৃষ্ণপক্ষের দ্বাদশী। কৃত্তিকার নক্ষত্রমণ্ডলীতে ঢলে পড়েছে চন্দ্র। এমন সময় মহারাজের অন্তঃপুরে বিপুল কোলাহল উঠল। সম্ভ্রমভরে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো যশোবতীর স্নেহের প্রাত্রী ধাত্রী নন্দিনী, ‘সুযাত্রা’। দৌড়ে গিয়ে রাজার চরণ বন্দনা করে বলল, ‘হে দেব, অতি সৌভাগ্যের বিষয়, জন্মগ্রহণ করেছেন দ্বিতীয় পুত্র। শক্তিতে যিনি ইন্দ্র, শান্তিতে যিনি অশোক, মেঘের মতো নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে বর্ষিত হয় যার দান, ইনিই হর্ষবর্ধন।’ পঞ্চম অধ্যায়ে হুনদের বিরুদ্ধে অভিযানের বর্ণনা আছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে আছে ভগ্নিপতি গ্রহবর্মা নিহত হওয়ার ঘটনা। হর্ষের শশাঙ্ক দমনের ঘটনাও। সপ্তম অধ্যায়ে হর্ষের দিগ্বিজয়ী অভিযানের বর্ণনা আছে।

 

শেষ অধ্যায় : দানশীলতা

হর্ষ তাঁর আদায়কৃত রাজস্ব চার ভাগে ভাগ করে খরচ করতেন। ক) রাজ্য শাসন ও ধর্মীয় উপাসনা বাবদ খরচ, খ) কর্মচারীদের বেতন ও ভরণ-পোষণ খরচ, গ) বুদ্ধিজীবী ও গুণীজনদের বৃত্তি প্রদান এবং ঘ) বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দান। তাঁর সময় প্রয়াগে আয়োজন করা হতো দানমেলার। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল প্রয়াগে হতো এ মেলা। এ মেলার নাম ছিল মহামোশ্য পরিষদ। পাঞ্জাব, কনৌজ, বিহার, বাংলা বা উড়িষ্যা থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ যোগ দিত এ মেলায়। নাবালক, অসহায় ও দরিদ্র ব্যক্তিরা হর্ষবর্ধনের হাত থেকে দান গ্রহণ করত। এ ছাড়াও ব্রাহ্মণ, শ্রমণ ও সন্যাসীরাও এ মেলায় এসে দান গ্রহণ করতেন। দানক্রিয়া চলত টানা চার দিন। প্রথম দিন বুদ্ধের উপাসনা করা হতো এবং ভিক্ষুদের মুক্তহস্তে দান করা হতো। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন সূর্য ও শিবের পূজা করা হতো। চতুর্থ দিন আবার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দান করা হতো। এভাবে দান চলত। কিন্তু একসময় দেখা যায় রাজকোষে জমাকৃত অর্থ নিঃশেষ হয়ে গেছে। দানবীর হর্ষবর্ধন তাতে কিন্তু বিচলিত হননি। পরিশেষে তিনি নিজের অলংকার এবং পোশাকও দান করে দিলেন। পরে ভগিনী রাজ্যশ্রীর দেওয়া একটি পোশাক পরে গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। হর্ষবর্ধনের চরিত্রে সমাবেশ ঘটেছিল সমুদ্রগুপ্তের সমরকুশলতা ও সম্রাট অশোকের প্রজাহিতৈষী নীতির। ৪০ বছর রাজত্ব করার পর ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে এ মহান শাসকের জীবনাবসান ঘটে। 

 

বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঠাকুর পরিবারের সন্তান প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর। ভূমিকায় লিখেছেন ‘যষ্ঠ শতাব্দীর এই হর্ষচরিতে ভঙ্গুর ভারতবর্ষের পূর্বকালীন সামাজিক শ্রী, প্রাদেশিক আচার, বন-গ্রামিক কৌলীন্য, জনতার দেশাত্মবোধ ও নির্ভীকতা, রাষ্ট্রীয়প্রীতি, এমনকি সামরিক দণ্ডযাত্রার নকশা, সতীদাহ ও সাধারণ জীবনযাত্রার একটি সম্পূর্ণ চিত্র দেখতে পাওয়া যায়।’



সাতদিনের সেরা