kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

অতীত পানে চেয়ে

হারিয়ে যাওয়া আফ্রিকান শহর

কোথাও কোনো পুরাকীর্তি ধ্বংস হতে দেখলে আজ ইউরোপিয়ানরাই বেশি গলা উঁচু করে। অথচ তারাই ধ্বংস করেছিল আফ্রিকার শতাধিক আদি শহর। জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

২৭ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হারিয়ে যাওয়া আফ্রিকান শহর

টিম্বাকটু শহরের হ্যারিটেজ অংশ

মধ্য যুগে সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছানো ‘বেনিন’ শহরটি গড়ে তুলেছিল এদো গোত্রের লোকেরা। ১৩ শতকে এক ইউরোপীয় পরিব্রাজক গিয়েছিলেন নাইজেরিয়ার এই শহরে। শহরটিতে ঢুকতেই ছিল এক বিশাল রাজপথ। আমস্টারডাম শহরের সবচেয়ে পুরনো সড়কগুলোর একটি ওয়ারমস স্ট্রিটের চেয়েও অন্তত সাত-আট গুণ চওড়া ছিল বেনিনের সেই রাজপথ। শহরটিতে সব মিলিয়ে প্রধান সড়ক ছিল ৩০টির মতো। সেগুলো থেকে এদিকে-ওদিকে গলি-ঘুপচি যে কত ছিল, গোনা-গুনতি নেই। রাজপ্রাসাদ ছিল বিশাল এলাকাজুড়ে। আকারে রাজপ্রাসাদটি ছিল নিউ ইয়র্কের হার্লেমের সমান। আর এই পুরো প্রাসাদঘেরা ছিল দেয়াল দিয়ে।

দেয়াল কেবল রাজপ্রাসাদের চারপাশেই ছিল না, ছিল পুরো শহর ঘিরেই। শহরটিতে প্রায় শ পাঁচেক বসতি ছিল। অনেকটা এখনকার পাড়া-মহল্লার মতো। সবগুলোর চারপাশ দেয়ালঘেরা। এ এলাকাগুলো আবার ছিল পরস্পর যুক্ত। কাজেই পুরোটা মিলে একটাই দেয়াল এঁকেবেঁকে পুরো বেনিনকে ঘিরে ছিল। সব মিলিয়ে এই দেয়াল প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার ছড়িয়ে ছিল। মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার। মানে পাহাড়-নদী-খাঁড়ির মতো প্রাকৃতিক অংশ বাদ দিয়ে শুধু স্থাপনাকে হিসাবে নিলে, এই দেয়াল চীনের মহাপ্রাচীরের কাছাকাছি। ১৯৭৪ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এটিকে যান্ত্রিক যুগের আগে নির্মিত সবচেয়ে বড় ‘মাটির কাজ’-এর স্বীকৃতিও দেয়।

রাজপ্রাসাদের আশপাশে রাজা-যুবরাজ, মন্ত্রীদের জন্যও ছিল সুন্দর সুন্দর সব বাড়ি। ছিল বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর গ্যালারিও। সেগুলোর বেশির ভাগই আকার-আয়তনে ছিল আমস্টারডামের গ্যালারিগুলোর মতোই বড়সড়। অবশ্য সাধারণ মানুষদের বাড়িগুলো বেশ লাগালাগিই ছিল। তবে বেশ পরিকল্পিত আর সাজানো। সবচেয়ে বড় বিষয়, এদোরা ছিল খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ওরা বাড়িঘর এতটাই পরিষ্কার রাখত, দিনের বেলায় ওগুলো কাচের মতো ঝকঝক করত।

ওরা ব্রোঞ্জ দিয়ে অসাধারণ সব ভাস্কর্য বানাত। বার্লিন জাদুঘরের এক কর্মকর্তা এগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বানাতে দিলে বেনভেনুতো সিলিনিও ওগুলোর চেয়ে ভালো বানাতে পারতেন না।’ এই সিলিনি ছিলেন ষোড়শ শতকের ইতালির বিখ্যাত ভাস্কর। কিন্তু বেনিন ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যগুলোও লুট হয়ে যায়। সেটা ১৮৯৭ সালের ঘটনা। অ্যাডমিরাল হ্যারি রাওজনের নেতৃত্বে ব্রিটিশরা বেনিন আক্রমণ করে। শহরটিকে একদম ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। শহরের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যগুলো লুট করে ব্রিটিশ যোদ্ধারা। সেগুলোর কয়েকটি এখনো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে। আর ১৯৭২ সালে এই ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে ৭০০টির মতো ভাস্কর্য জোগাড় করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী। মূল্য চুকিয়ে সেগুলো দেশে ফেরত নেয় নাইজেরিয়ার সরকার।

ইউরোপীয়দের হাতে ধ্বংস হওয়া আফ্রিকার আরেক বিখ্যাত শহর টিম্বাকটু। এখন অবশ্য এটা নিতান্তই হতদরিদ্র একটা শহর। রাস্তাঘাট নোংরা, গরিব-গুরবোতে ভরা। এমনকি শহরটিতে অনেক ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এখন লন্ডনের তুলনায় ২৩৬ গুণ ছোট হলেও, একসময় লন্ডনের চেয়েও পাঁচ গুণ বড় ছিল শহরটি। এই টিম্বাকটুই ছিল তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী শহর।

১৪ শতকের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয় তিনটি অঞ্চলকে—এশিয়ার চীনা সাম্রাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইরাক এবং পশ্চিম আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্য। এই তিনটির মধ্যে মালি সাম্রাজ্যই বেশি দিন টিকেছিল। অন্য দুটিরই পতন ঘটে চেঙ্গিস খানের হাতে। চেঙ্গিস বাহিনী ওই সাম্রাজ্যগুলো শুধু দখলই করেনি, শহরগুলোতে রীতিমতো ধ্বংসযজ্ঞের মহোৎসব করেছিল। কিন্তু মালি পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। ফলে মালিই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী সাম্রাজ্য। তখন এই সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি—মালির ‘মানসা’ বা সুলতান প্রথম মুসা।

মুসা মারা যান সম্ভবত ১৩৩৭ সালে। তখন তাঁর যে সম্পত্তি ছিল, তখনকার হিসাবেই মূল্য ছিল ৪০ হাজার কোটি ডলার। তখন পৃথিবীতে যত সোনা উত্তোলন হতো আর যত লবণ আহরণ হতো, তার অর্ধেকেরও বেশি হতো মালি সাম্রাজ্যে। সেই সোনা আর লবণ ছিল এই সাম্রাজ্য এবং মানসা মুসার অঢেল ঐশ্বর্যের উৎস। মুসার ঐশ্বর্যের অনেক গল্পও আছে। ১৩২৪ সালে মক্কায় হজ করতে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল ৬০ হাজার সহচর। সেখানে তিনি এত সোনা খরচ করেছিলেন আর বিলিয়েছিলেন যে মক্কায় সোনার দাম পড়ে যায়। সোনার দাম আবার স্বাভাবিক হতে লেগে যায় পুরো এক দশক!

এই মানসা মুসার মালি সাম্রাজ্যে ছিল এখনকার মালি, সেনেগাল, গাম্বিয়া আর গিনি। এ সাম্রাজ্যেরই কেন্দ্র  ছিল বর্তমান মালিতে অবস্থিত টিম্বাকটু। মানসা মুসার হাত ধরে টিম্বাকটু কেবল ঐশ্বর্যশালীই নয়, জ্ঞানে-সাহিত্যে-সংস্কৃতিতেও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। মুসার পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে একটি লাইব্রেরি গড়ে ওঠে। সে সময়ে সারা পৃথিবীতে যত বইয়ের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল, প্রায় সবগুলোরই একটি করে কপি ছিল সেখানে। এখনো ওখানে প্রায় সাত লাখ পুরনো বই আছে। ওসবের মধ্যে রয়েছে গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, কাব্য, আইন ও জ্যোতির্বিদ্যার বই। পৃথিবীর প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়াও ওই সময়ে ওই অঞ্চলেই লেখা হয়। সে সময়ে টিম্বাকটুর সামাজিক অবস্থা এমন ছিল যে, একজন বিদ্বানের ঘরে ১৬০০ বই থাকলেও সেটাকে ‘ছোটখাটো সংগ্রহ’ বলে গণ্য করা হতো। সে সময়ে অন্যান্য অঞ্চলের সব শিল্পী-সাহিত্যিক-সমালোচক-সমঝদাররা টিম্বাকটু যেতে চাইতেন। শুধু জ্ঞানে-শিল্পে-সাহিত্যেই নয়, তাঁরা স্থাপত্যবিদ্যা-নৌবিদ্যার মতো প্রায়োগিক জ্ঞানেও এগিয়ে গিয়েছিলেন অনেক দূর। আর টিম্বাকটুতে যখন এসব ঘটছে, ইউরোপ তখনো অন্ধকারে। ধর্মের নামে, গোত্রের নামে হানাহানি নৈমিত্তিক ঘটনা।

ইউরোপিয়ানদের হাতে ধ্বংস হওয়া সমৃদ্ধ আফ্রিকান নগর কেবল এ দুটিই নয়। এমন উদাহরণ আছে অন্তত শখানেক বা তারও বেশি। ইবনে বতুতা ১৩৩১ সালে তাঞ্জানিয়ার কিলওয়া শহর পরিভ্রমণ করে লেখেন, ‘পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর আর সুসংগঠিত, মার্জিত এক শহর।’ ১৫০৫ সালে পর্তুগিজদের হাতে মোম্বাসা শহরের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয় কিলওয়াও। অ্যাসান্টি সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কুমাসি। দশম শতকে গড়ে ওঠা ছবির মতো সুন্দর এ শহরটি ছিল স্থাপত্যবিদ্যার চূড়ান্ত উত্কর্ষের নিদর্শন। উনিশ শতকে ব্রিটিশ বাহিনী শহরটিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

আফ্রিকার সমৃদ্ধ নগরগুলোর প্রায় সবই ইউরোপীয়দের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। আর সেসব সমৃদ্ধ নগর, নগরকেন্দ্রিক সমৃদ্ধ সভ্যতা ধ্বংস করার পর আফ্রিকাকে বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এক ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’ হিসেবে। তারপর সেই অন্ধকারে নিমজ্জিত জাতিগোষ্ঠীদের ‘আলোকিত’ করার নামে চলে শোষণ-নিপীড়ন ও রমরমা দাস ব্যবসা।



সাতদিনের সেরা