kalerkantho

শনিবার । ২৭ চৈত্র ১৪২৭। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২৬ শাবান ১৪৪২

তোমায় সালাম

সুলতান সুলেমানের স্থপতি

ওসমান সুলতান ছিলেন না। কিন্তু তাঁর নাম থেকেই হয়েছে অটোমান। প্রায় ৭০০ বছর টিকেছিল এ অটোমান সাম্রাজ্য। ওসমানের এক উত্তরসূরি সুলেমানের আমলে সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছেছিল অটোমান সালতানাত। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন স্থপতি মিমর সিনান। সিনানকে অনেকেই তুরস্কের মাইকেল অ্যাঞ্জেলো বলতে ভালোবাসেন। তাঁকে খুঁজে ফিরেছেন মো. নাভিদ রিজোয়ান

১৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুলতান সুলেমানের স্থপতি

সুলতান সুলেমান মসজিদ

সিনান জন্মেছিলেন ১৪৮৯ বা ১৪৯০ সালে। আনাতোলিয়ার কায়শেরি শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরের আগিরনাস গ্রামে। তাঁর নাম রাখা হয়েছিল জোসেফ। সম্ভবত তিনি ছিলেন আর্মেনিয়ান বা আলবেনিয়ান খ্রিস্টান তুর্ক। সিনানের বাবা ক্রিস্টোস পাথরমিস্ত্রি বা কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। অটোমান সাম্রাজ্যে বিধর্মীদের ওপরও কর বেশি চাপানো হতো না। তবে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ (১৪২১-১৪৫১) দেভসিরুম নামের একটি প্রথা চালু করেন। আট থেকে ১৮ বছর বয়সীদের সরকার নিজের হেফাজতে নিত এ প্রথার মাধ্যমে। এদের  সাহিত্য, কলা, স্থাপত্য বা চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলা হতো। অনেকেই হতেন যোদ্ধা। উজির পদেও আসীন হতেন অনেকে। যেমন সুলতান সুলেমানের প্রধান উজির ইব্রাহিম পাশাও জন্মসূত্রে ছিলেন খ্রিস্টান। এঁদের তত্ত্বাবধানের জন্য আলাদা দপ্তর চালু করা হয়েছিল, নাম জানিসারি।

১৫১২ সালে মিমর সিনান জানিসারিতে আনীত হন। কিন্তু তাঁর বয়স তখন বেশি হওয়ায় তিনি ইম্পেরিয়াল এন্দেরুন স্কুলে পড়তে পারেননি। কিছু নথিপত্রে আছে, তিনি ইব্রাহিম পাশার সরাসরি ছাত্র ছিলেন। অঙ্কে ভালো করছিলেন, কাঠের কাজেও মনোযোগী ছিলেন। যোদ্ধা হওয়ার প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তিনি ইরাক ও ইরানে যুদ্ধ করেছিলেন। 

সুলেমানের অশ্বারোহী বাহিনীতে

সুলতান সুলেমানের ব্যক্তিগত অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্যও ছিলেন সিনান। তাঁকে রাজকীয় রক্ষীবাহিনীর অধিনায়কের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। একবার তাঁকে অস্ট্রিয়ায় পাঠানো হয় রাইফেল বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে। তিনি ভালো তীরন্দাজ ছিলেন। তিনি গোলন্দাজ বাহিনীর পরামর্শকও ছিলেন। বিরোধী পক্ষের স্থাপনাগুলোর দুর্বল জায়গা খুঁজে পেতে সাহায্য করতেন। কায়রো অটোমানদের দখলে আসার পর সিনান সামরিক স্থপতির মর্যাদা লাভ করেন। তিনি অনেক সেতু নির্মাণ করেন। দানিয়ুব নদীর ওপরের সেতুটি যেমন বিখ্যাত। ১৫৩৫ সালের পারস্য অভিযানের সময় কামান পারাপারের জন্য তিনি জাহাজ তৈরি করেন। 

নগর স্থপতি

সামরিক স্থপতি হিসেবে তাঁর সুনাম ও দক্ষতা নগর স্থপতি হওয়ার দরজা খুলে দেয়। ১৫৩৯ সালে সেলেবি লুতফি পাশা গ্র্যান্ড উজির হলে তিনি সিনানকে স্থাপত্য বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি অনেক রাস্তার নকশাও করেন। নগরে পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর অনেক সহযোগী ও ছাত্র ছিল। জানা যায়, সিনান প্রায় ৩৭৪টি স্থাপনার নকশা করেছিলেন, যার মধ্যে বড় মসজিদ ৯২টি, ৫৫টি স্কুল, মাদ্রাসা সাতটি, ২০টি সমাধি, ১৭টি পাবলিক রেস্তোরাঁ, তিনটি হাসপাতাল, ছয়টি জল সরবরাহ ব্যবস্থা, ১০টি সেতু, ২০টি সরাইখানা, ৩৬টি প্রাসাদ আছে। সিনানের নকশা করা মসজিদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শেহজাদে মসজিদ আর সুলেমানিয়া মসজিদ।

শেহজাদে মসজিদ

১৫৪৩ সালে হাঙ্গেরির অভিযান থেকে ফেরার পথে সুলতান সুলেমান ও হুররাম সুলতানের ছেলে শেহজাদে মেহমেদ (শাহজাদা মাহমুদ) গুটিবসন্তে মারা যান। সুলতান তাঁর প্রিয় সন্তানের শোকে প্রায় ৪০ দিন ছেলের কবরের পাশে কাটিয়ে দেন। সুলেমান তখন সিনানকে দায়িত্ব দেন শাহজাদার নামে একটি ব্যয়বহুল মসজিদ তৈরি করতে। সেই মসজিদটিই শেহজাদে মসজিদ হিসেবে এখনো পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। 

সুলতান সুলেমান বা সুলেমানিয়া মসজিদ

ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি। সুলতান সুলেমানের হুকুমে সিনান এর কাজ শুরু করেন ১৫৫০ সালে এবং শেষ করেন ১৫৫৭ সালে। সিনান বাইজান্টাইন চার্চ হাজিয়া সোফিয়ার অর্ধেক গম্বুজের ধারণা ব্যবহার করেন, কাজে লাগান এ মসজিদের নির্মাণশৈলীতে। এর মিনারগুলো পেনসিলের মতো এবং ছোট-বড় অসংখ্য গম্বুজ মিলিয়ে এটি এক অনন্য স্থাপনাশিল্প। ভেতরের শৈলীও দৃষ্টিনন্দন। শব্দ নিয়ন্ত্রণের জন্য থাম আর দেয়ালগুলোর ভেতরে তিনি অনেক অনেক ঘড়া ব্যবহার করেছিলেন। মসজিদ কমপ্লেক্সে হাসপাতাল, স্কুল, সরাইখানা, সাধারণের জন্য গোসলখানা, মক্তব, হাদিস স্কুল, মেডিক্যাল কলেজ ইত্যাদিও নির্মিত হয়েছিল।

সিনান যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

সিনান পুরো শহর মাথায় রেখে কাজ করতেন। তাঁর একটি স্থাপনা ইস্তাম্বুলের একেকটি রত্ন। অটোমানরা গম্বুজের বেলায় চারকোনা কাঠামোর ধারণা এনেছেন। সিনানের মসজিদগুলোর সবগুলোয়ই নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বড় থেকে ক্রমান্বয়ে ছোট জানালা থাকত। তাই প্রার্থনাকারীরা স্বর্গীয় অনুভূতি লাভ করতেন। রাতে তেলের কুপির ধোঁয়া যেন নির্দিষ্ট স্থানে জমা হতে পারে, তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখতেন সিনান। পরে তা থেকে ছাত্ররা কালি সংগ্রহ করত। তিনি মসজিদের দেয়ালে ফুল বা পাতার নকশা করতেন। সিনান  ১৫৭০ সাল থেকে তাঁর দক্ষতার শিখরে পৌঁছেছিলেন। সেলিমিয়া মসজিদের কাজ শেষ করতে করতে তাঁর বয়স হয়ে গিয়েছিল ৮০। তিনি মারা যান ১৫৮৮ সালে। সুলেমান মসজিদের পাশেই আছে তাঁর কবর। পর্যটকরাও জিয়ারত করতে ভোলেন না।

মন্তব্য