দেশের রিয়েল এস্টেট ও আবাসন খাতে মূল্য অস্বচ্ছতা ও কর ফাঁকি রোধে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জমি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারি ‘মৌজা রেট’ বা দাপ্তরিক মূল্য পরিবর্তন করে বাজার মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল রবিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত অগ্রগতি হয়। সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), ভূমি মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বর্তমান ব্যবস্থার নানা সমস্যা তুলে ধরা হয়। সরকারি মৌজা রেট অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজার মূল্যের তুলনায় কম হওয়ায় দলিল নিবন্ধনে কৃত্রিম মূল্য দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে করে প্রকৃত লেনদেন মূল্য আড়াল হয়ে যাচ্ছে এবং বিপুল অঙ্কের অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবস্থার বাইরে চলে যাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, একটি জমির বাজার মূল্য যদি ১০ কোটি টাকা হয়, তবে দাপ্তরিক মূল্য অনেক ক্ষেত্রে দুই কোটি টাকার কাছাকাছি দেখানো হয়। ফলে বাকি অংশ করের আওতার বাইরে থেকে যায়। এতে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারায়, অন্যদিকে কালো টাকার বিস্তার বাড়ে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে মত দেন যে এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি এবং উৎস কর বাবদ সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। অথচ স্থাবর সম্পত্তি খাত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে কয়েকটি পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের সমন্বয়ে একটি যৌথ টেকনিক্যাল কমিটি গঠন, যারা অঞ্চলভিত্তিক বাস্তব বাজার মূল্য বিশ্লেষণ করে নতুন গাইডলাইন তৈরি করবে। এ ছাড়া মৌজা রেট নির্ধারণ প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে নিয়মিত বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে এটি সমন্বয় করা যায়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর অভিজাত এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এতে উৎস কর ও নিবন্ধন ব্যয়ের কাঠামো আরো বাস্তবসম্মত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে কিছু নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বাজারভিত্তিক নতুন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে এটি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
এ ছাড়া অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহার করে সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে করহার পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যাতে প্রকৃত মূল্য দেখাতে করদাতারা উৎসাহিত হন এবং অর্থনীতির স্বচ্ছতা বাড়ে।