kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

‘আমার ছেলেদের দেখে রেখো’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আমার ছেলেদের দেখে রেখো’

ছেলের শোকে মূর্ছা যাচ্ছেন জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত শরিফ হোসেনের মা পাঞ্জুয়ারা বেগম। গতকাল সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার বেড়াখারুয়া গ্রামে। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘চিন্তা করিও না, আমি ভালো আছি। শিগগিরই বাড়ি যাব, তখন অনেক কথা হবে। ’ ঘটনার সাড়ে তিন ঘণ্টা আগে স্ত্রী শিমু আক্তারকে কথাগুলো বলেছিলেন জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে প্রাণ হারানো জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় মা গোলেনুর বেগম ছেলেকে (জাহাঙ্গীর) বলেছিলেন, ‘বাবা বাড়ি আইসো, অনেক দিন তোমাকে দেখি নাই।

বিজ্ঞাপন

’ উত্তরে ছেলে বলেছিলেন, ‘মা, আর দুই মাস পর বাড়ি আসব। ’

জাহাঙ্গীর নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ তিতপাড়া গ্রামের লতিফর রহমানের পাঁচ ছেলের মধ্যে চতুর্থ। গত সোমবার মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সময় আইইডি বিস্ফোরণে সৈনিক জাহাঙ্গীরসহ তিন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত ও একজন আহত হন। তিনজনের মৃত্যুতে বাড়িতে চলছে মাতম।

জাহাঙ্গীরের বড় ভাই সেনা সদস্য আবুজার রহমান জানান, জাহাঙ্গীর ২০১৫ সালে ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এক বছর আগে বিয়ে করেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শান্তি রক্ষা মিশনে যান। গতকাল বুধবার সকালে জাহাঙ্গীরের বাড়িতে দেখা যায়, মা, স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের আহাজারি করছেন। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা। পরিবার জানায়, গত সোমবার রাত ১০টার দিকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় জাহাঙ্গীরের।

‘ছেলেদের মানুষ কোরো’

‘নিজের মেয়ের মতো আমার দুই ছেলেও (৬ ও ২) তোমার সন্তান। তুমিই তাদের দেখে রাখবে। আমাকে যেভাবে বড় করে তুলছো সেভাবেই তাদের বড় করে তুলবে। মানুষ করে তুলবে। ’ কথাগুলো ৩ অক্টোবর রাতে মোবাইল ফোনে ভাই মো. জুলহাস মিয়াকে বলেছিলেন শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়ে বিস্ফোরণে নিহত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের খাটিংগা গ্রামের সৈনিক মো. জসীম মিয়া। জুলহাস গতকাল দুপুরে ভাইয়ের এসব কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কালের কণ্ঠকে জুলহাস জানান, ২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মিশনে যান জসীম। এর পর থেকেই তাঁরা নানা শঙ্কায় থাকতেন।

জসীম মুক্তিযোদ্ধা মো. নূরু মিয়ার ছেলে। জসিমরা চার বোন, দুই ভাই। একান্নভুক্ত পরিবার। ১০ বছর আগে চাকরিতে যোগ দেন জসীম। তাঁর মৃত্যুতে স্ত্রী শারমীনের কান্নায় বাতাস ভারী। বৃদ্ধ বাবা বাকরুদ্ধ।

একমাত্র অবলম্বন শরিফ

‘খলিফার কাজ করে, অন্যের বাড়ির সুতা তুলে ছেলেকে বড় করেছিলাম। আমার ওই ছেলেও তাঁতের কাজ করত, ওর বাবা বেকার, ছোট ছেলেও তাঁতের কাজ করে। ছোট মেয়ে এইচএসসিতে পড়ছে। চাকরি নেওয়ার পর বড় ছেলের ওপরই ভরসা ছিল আমার। সেই ছিল পরিবারের অবলম্বন। দেশে এসে ছোট বোনকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল; কিন্তু চাকরিতে বিদেশে গিয়ে সে মারা গেছে। আমার সংসার এখন কেমনে চলবে! সরকার সহযোগিতা না করলে আমাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। ’

নিহত ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদছিলেন আর এসব কথা বলছিলেন মা পাঞ্জুয়ারা বেগম। আহাজারি করছিলেন বাবা, স্ত্রী, ভাইও। গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জের বেলকুচির বেড়াখারুয়া গ্রামের নিহত সৈনিক শরিফ হোসেনের বাড়িতে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। শরিফ বেড়াখারুয়ার লেবু তালুকদারের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে শরিফ বড়। এক বছর আগে শরিফ বিয়ে করেন। স্বামীর শোকে পাথর স্ত্রী সালমা খাতুন বলছিলেন, ‘আল্লাহ আমার স্বামীরে নিয়ে গেছে, আমি এখন কী করমু!’

শরিফের এসএসসি পাস করা ছোট তাঁত শ্রমিক কাওসার তালুকদার বলেন, ‘সেনাবাহিনী বা সরকার যদি আমাকে একটা চাকরি দিত, তাহলে আমি পরিবারের হাল ধরতে পারতাম। ’

প্রতিবেশী মাহমুদুল হাসান বলেন, গতকাল সেনাবাহিনীর বগুড়া ক্যাম্পের একটি টিম বাড়িতে এসে সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে শরিফের পরিবারকে এক লাখ টাকা দিয়েছে। শরিফের কর্মস্থল সিলেট সেনানিবাসের একটি টিম এসেও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।

এসএসসি পাসের পর ২০১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। শান্তি রক্ষা মিশনে যোগ দিতে গত বছরের ২ ডিসেম্বর দেশত্যাগ করেন শরিফ।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন নীলফামারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি]

 

 



সাতদিনের সেরা