kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

কন্যাশিশুদের ওপর সাইবার আক্রমণ বেড়েছে

নিখিল ভদ্র   

১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কন্যাশিশুদের ওপর সাইবার আক্রমণ বেড়েছে

বহুল আলোচিত কলেজ শিক্ষিকা খায়রুন্নাহার প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন কলেজছাত্র মামুনকে। বয়সের ব্যবধান এবং অসম ওই বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে ওঠে অতি উৎসাহী কিছু মানুষ। এরপর সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপ সইতে না পেরে খায়রুন্নাহার আত্মহত্যা করেন। গত ১৪ আগস্ট নাটোর শহরের বলারিপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এর আগে ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পড়লে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বি কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী উপমা মিস্ত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ ঘটনায় ২৫ জুলাই মোরেলগঞ্জ থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, ছাত্রী উপমা সম্পর্কে আপত্তিকর কথাবার্তা এবং ফেসবুকে একটি ফেক আইডির চ্যাটিংয়ের কিছু স্ক্রিনশট ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন একই এলাকার দুই যুবক। তাঁদের একজন উপমাকে অডিও রেকর্ড পাঠিয়েও হুমকি দেন।

এ ধরনের সাইবার আক্রমণ ও বুলিংয়ের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে বলে তথ্য দিয়েছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। সারা দেশে কন্যাশিশু নির্যাতন নিয়ে ফোরামের পক্ষ থেকে ২০২১ সালে পরিচালিত জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিদিন সহস্রাধিক কন্যাশিশু পর্নোগ্রাফি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। তাদের বেশির ভাগই কোনো অভিযোগ করে না। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন ভিকটিম সাইবার হয়রানি সম্পর্কিত অভিযোগকেন্দ্রে মৌখিক বা লিখিতভাবে অভিযোগ দাখিল করে। অবশ্য তাদের অনেকের জানা নেই কিভাবে, কোথায়, কার সহায়তায় এ বিষয়ে অভিযোগ করা যায় বা এর ফলাফল কী হবে। ২০২১ সালে ২৪২ জন কন্যাশিশু আত্মহত্যা করে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বুলিং বলতে সাধারণত দুজন ব্যক্তির মধ্যে তর্ক বা কথা-কাটাকাটির জেরে একজন ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে সবার সামনে দোষারোপ বা খারাপ ভাষায় আক্রমণ করা বোঝায়। আবার একজনের ছবি বা ভিডিও বিকৃত করে অনলাইনে তুলে ধরাও বুলিংয়ের মধ্যে পড়ে। অনলাইনে কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করে আরেকজনকে আঘাত করছে। অথবা কারো গোপন তথ্য ফাঁস করার হুমকি দিচ্ছে। ইন্টারনেটকেন্দ্রিক এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাইবার বুলিং। করোনাকালে এই সাইবার বুলিং কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মানুষের অনলাইননির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে সাইবার অপরাধীদের শিকারে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে নারী ও শিশুরা প্রধান শিকার।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ২০১৯ সালে বাংলাদেশে একটি জরিপ চালায়। ওই জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশের ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও উত্পীড়নের শিকার হয়েছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া ৩৮ শতাংশ মানুষের বয়স ১০ থেকে ১৩ বছর, ৩৬ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ১৫ বছর এবং ২৫ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ১৭ বছর। ঢাকায় অনলাইনে হয়রানির শিকার নারীদের ৭০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পোশাক, দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরন ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের মাধ্যমে ভাইরাল করা হয়। ফলে ভিকটিমই ব্লেমিংয়ের শিকার হচ্ছে। কখনো কখনো অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়। আবার অপরাধীকে ভাইরাল করার প্রবণতাও আছে। এসব কারণে সামাজিক, পারিবারিক ও আত্মসম্মান সংকটে পড়ে কেউ কেউ মৃত্যুকে বেছে নেয়। আবার কেউ কেউ সমাজ কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

শিশু অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন বেসরকারি সংস্থা টিম অ্যাসোসিয়েটসের টিম লিডার পুলক রাহা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সাইবার স্পেসে মানহানি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রাইভেট মেসেঞ্জার বা এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও শেয়ার করার প্রবণতা বেড়েছে। আর এসব কনটেন্ট যখন কোনো অসাধু ব্যক্তির দখলে চলে যায়, তখনই ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার শিকার হচ্ছে শিশুরাও। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

শিশু অধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. শামসুল হক টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করলে প্রতিকার পাওয়া যায়। এ ছাড়া মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হটলাইন ১০৯২১ নম্বরে জানালে গোপনীয়তা রক্ষা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সরাসরি বিটিআরসির ফোনে ও ই-মেইলেও অভিযোগ করা যায়।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ অধ্যক্ষ রওশন আরা মান্নান বলেন, সাইবার বুলিংসহ শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচারকাজ শেষ করতে হবে।

 

 



সাতদিনের সেরা