kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বাদ্যের তালে জমজমাট ঢাকের হাট

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাদ্যের তালে জমজমাট ঢাকের হাট

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ঢাকের হাটে পূজা আয়োজকদের কাছে সুর-তালের পরীক্ষা দিচ্ছে বাদকদল। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী সদরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিবছরই জমজমাট ঢাকের হাট বসে। এ বছর গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে এ হাট। চলবে শনিবার ষষ্ঠীর ভোররাত পর্যন্ত। এ হাটে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকঢোলসহ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছে বাদকদল।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়রা জানায়, দুর্গোৎসব ঘিরে চারপাশের আড়ম্বর যা-ই থাক, ঢাক-ঢোলের বাজনা ছাড়া পূর্ণতা পায় না পূজা। ষষ্ঠী থেকে বিসর্জন সবখানে চাই ঢাকের আওয়াজ। এ প্রয়োজন থেকেই প্রায় ৫০০ বছর ধরে কটিয়াদীতে বসছে ঐতিহ্যবাহী এ ঢাকের হাট। কেবল সনাতন ধর্মের নয়, অন্য ধর্মের লোকজনও ভিড় করে হাটে। তাদের কাছে এটি কেবল হাট নয়, হয়ে গেছে সংস্কৃতির অংশও।

গতকাল দুপুরে ঢাকের হাটে গিয়ে দেখা যায়, বাদ্যযন্ত্রের বোল-তাল আর সুরের মূর্ছনায় মুখরিত কটিয়াদীর পুরান বাজার। বাদ্যের তালে তালে চলছে সুরেলা লড়াই। সুর-ছন্দে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে—এ প্রতিযোগিতা। আর বাদকদলের এসব মুনশিয়ানা ঘরে ঘরে উপভোগ করছেন পূজা আয়োজকরা। এরই মধ্যে চলছে দরদামও। বাজনা পছন্দের পাশাপাশি দরদামে মিল হলে সেই বাদকদলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন তাঁরা।

কটিয়াদী সদরের বাসিন্দা ধ্রুবরঞ্জন দাস বললেন, ব্যতিক্রমী এ হাট তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র বেচাকেনা হয় না। যারা এসব বাজান, সেই ঢাকি বা বাদকদল অর্থের বিনিময়ে পূজা আয়োজকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। পরে তারাই বাদ্যের তালে তালে মাতিয়ে রাখে পূজামণ্ডপগুলো। বাদকদলের ‘সম্মানী’ নির্ধারণ হয় তাদের দক্ষতা ও বাদ্যযন্ত্রের সংখ্যার ভিত্তিতে।

দোহার নবাবগঞ্জ থেকে তিনজনের একটি বাদকদলের নেতা হয়ে হাটে এসেছেন বিনয় রায়। তিনি জানান, এবার পূজার আয়োজন বেশি। এ কারণে তাঁদের চাহিদা বেড়েছে। তাঁর দলের পারিশ্রমিক কেউ কেউ ৪০ হাজার টাকা বলছেন, তবে তাঁরা ৬০ হাজার টাকার কমে যাবেন না।

কিশোরগঞ্জ সদর থেকে মো. রোকন সাতজনের একটি দল নিয়ে এসেছেন। তিনি বললেন, এটি তাঁর পেশা না। শখ আর বাড়তি আয়ের জন্য এসব করেন।

স্থানীয়দের দাবি, এ আয়োজন চলছে প্রায় ৫০০ বছর ধরে। অন্যান্য জায়গায় বাদকদল সাধারণত ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ হয় আয়োজকদের সঙ্গে। তবে কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের জেলার রীতি কিছুটা ভিন্ন। এ অঞ্চলের পূজা আয়োজকরা ঢাকের হাটে দক্ষতা যাচাই করে মণ্ডপের বাদ্য বাজাতে আমন্ত্রণ জানান বাদকদের।

ময়মনসিংহের নান্দাইলের পিন্টু পাল এসেছেন ঢাক ভাড়া করতে। তিনি বললেন, এবার ৫০ হাজার টাকায় তিনজনের একটি বাদকদলের সঙ্গে কথা পাকা করে ফেলেছেন তিনি।

বিভিন্ন বাদকদলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকার নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এ হাটে হাজির হয়েছে অসংখ্য বাদকদল। ঢাক-ঢোলের পাশাপাশি কাঁসি, সানাই, নানা জাতের বাঁশি, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ নানা জাতের বাদ্যও ভাড়ায় খাটে পূজায়। তা ছাড়া বর্তমানে বাদকদলে ঐতিহ্যবাহী বদ্যের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও।   

কটিয়াদী হিন্দু বৌদ্ধা খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি বেণী মধাব ঘোষ জানান, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে কটিয়াদীতে প্রথম ঢাকের হাটের সূচনা হয়। তিনি ওই সময় রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। একবার তিনি পূজার প্রয়োজনে সেরা ঢাকির সন্ধানে বিক্রমপুর পরগনায় বার্তা পাঠান। তখন নৌপথে বহু ঢাকি কটিয়াদী আসেন। রাজা নিজে বাজনা শুনে সেরা দলটি বেছে নেন। সেই থেকেই শুরু এ ঢাকের হাটের।

হাটে আসা বাদকদলের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন। তবে বাদকরা জানান, এসব যথেষ্ট নয়, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে আরো জমজমাট হবে এ ঢাকের হাট।

 



সাতদিনের সেরা