kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ নভেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

নদী শুকিয়ে জোয়ারে ভাসছে সুন্দরবন

বিশ্ব নদী দিবস আজ

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নদী শুকিয়ে জোয়ারে ভাসছে সুন্দরবন

গেল পূর্ণিমায় সুন্দরবনের করমজলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। আগের পূর্ণিমায়ও তলিয়েছিল। সাধারণভাবে বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের পানি বৃদ্ধিতে এ ঘটনা ঘটছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।

বিজ্ঞাপন

শুকিয়ে যাওয়ায় সুন্দরবন অঞ্চলের নদী-নালা-খাল পানি ধারণ করতে পারছে না। এতে পূর্ণিমার জোয়ারে ভাসছে সুন্দরবন। নদী-বাঁধ ভেঙে নিমজ্জিত হচ্ছে বসতি-ফসলি জমি।

গেল পূর্ণিমায় করমজল ট্যুরিস্ট স্পটে গড়ে তিন ফুটেরও বেশি পানি জমেছিল। বনের মধ্যে ভ্রমণকারীদের হাঁটার পথ (ট্রেইল) ডুবে যায়। ভ্রমণকারীদের চলাচলের সব জায়গাই ছিল পানিতে নিমজ্জিত। গোটা বনের বেশির ভাগ এলাকাই কম-বেশি ডুবে ছিল। এতে বন্য প্রাণীগুলোর চলাচলেও সমস্যা হয়। বনের মধ্যকার উঁচু জায়গাগুলোই ছিল তখন বন্য প্রাণীদের জন্য আশ্রয়স্থল। অবশ্য এখন উঁচু জায়গাও কমেছে। এ ঘটনায় বনের মধ্যে বেশ কিছু উঁচু টিলা তৈরি করার চেষ্টা করছে বন বিভাগ।

করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির কালের কণ্ঠকে জানান, এবারের পূর্ণিমায় যে পরিমাণ পানি উঠেছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি ওই কেন্দ্রে ১২ বছর কাজ করেন। তিনি গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে পানি উঠতে দেখেছিলেন, তবে তা ছিল পরিমাণে অল্প। এবার পরপর দুই পূর্ণিমায় পানি উঠতে দেখলেন। এই সময়টিতে সাগরে নিম্নচাপ ছিল, পানির পরিমাণও ছিল বেশি। তাঁর মতে, সুন্দরবনের ৯০ শতাংশ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়। ভাটায় পানি কমেছে, আবার জোয়ারে পানি উঠেছে—এভাবে তিন দিন সুন্দরবন এলাকা প্লাবিত ছিল। এ সময় ছোট হরিণ, শূকরসহ পানিতে অনভ্যস্ত এবং গাছে উঠতে না পারা প্রাণীগুলো খুবই সংকটে পড়ে।

সুন্দরবনের ওপর নজর রাখেন, সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করেন, গবেষণা করেন, এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবন অঞ্চলে জোয়ারের সমস্যা নতুন নয়, জলোচ্ছ্বাসও আগে হতো, ঘূর্ণিঝড়ের সময় তো জলোচ্ছ্বাস ছিল ভয়াবহ। কিন্তু জলোচ্ছ্বাস ও নোনা পানির হাত থেকে রক্ষা পেতে নদীতে বাঁধ দেওয়া এবং পোল্ডার পদ্ধতি গড়ে তোলায় জোয়ারের পানিতে আসা বিপুল পলি নদী-খাড়িতে জমা হয়ে নদী-নালাগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। যা বিপদ ডেকে আনছে। সমুদ্রের জোয়ারের পানি আসবেই, সেই পানি উত্তরের দিকে ধেয়ে আসবে সেটাই স্বাভাবিক; আর পানি ধারণের জায়গা না পেলে তা দুকূল ছাপিয়ে যাবে। এভাবেই সুন্দরবন প্লাবিত হচ্ছে, যা দিনকে দিন বাড়ছে। এরই মধ্যে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বড় নদী পশুর, শিবসা, রায়মঙ্গল, কপোতাক্ষ, ভোলাসহ অনেক নদী শুকিয়ে মরতে বসেছে। ছোট অনেক নদী-খাল মরে শুকিয়ে গেছে।

খুলনার একেবারে দক্ষিণে সুন্দররবনসংলগ্ন দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের বাসিন্দা হয়রত আলী। তিনি নিয়মিত সুন্দরবনে মাছ ধরার জন্য যান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন নদীতে খুব পলি আসে। সেই পলি নদীর বুকে জমা হয়ে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। নদীর বুক উঁচু হয়ে বনের সমান হয়ে গেছে।   

জানতে চাইলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশের উপকূল ভাগের পশ্চিম অংশ (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলা) মূলত গঙ্গা এবং তার শাখা নদীর অবক্ষেপণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ভূমি গঠন অনুসারে এই অঞ্চলের উত্তরের অংশ পুরাতন গাঙ্গেয় প্লাবন ভূমি, মধ্যের অংশ জোয়ার-ভাটা প্লাবন ভূমি ও দক্ষিণের অংশে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, বাংলাদেশে যার পরিমাণ ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। প্লাবন ভূমি প্রতিদিন দুবার জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয়। ষাটের দশকে সিইপি (কোস্টাল ইমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট)-এর আওতায় পোল্ডার পদ্ধতি গড়ে তোলায় এখানকার প্রতিবেশ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ভূমিতে পলি অবক্ষেপণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদীগর্ভে পলি জমা হয়ে নদী ভরাট হয়, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এখন পূর্ণিমায় যে জোয়ার তৈরি হচ্ছে, তা নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় ওই পানি ধারণ করতে পারছে না। কিন্তু জোয়ারের এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না, এটি প্রাকৃতিক, হবেই। ফলে জোয়ারে আসা পানি ধারণ করতে না পারলে তা উপচে পড়বে, এলাকা প্লাবিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। ’ ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

 

 

 



সাতদিনের সেরা