kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ফুটবলে রাঙানো জীবন রূপনা চাকমার

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ফুটবলে রাঙানো জীবন রূপনা চাকমার

রূপনার বাড়িতে গিয়ে তাঁর মায়ের সঙ্গে সেলফি তোলেন জেলা প্রশাসক। বুধবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এখনো ঘুমঘোরে দূর অতীতে ফিরে যান কালাসোনা চাকমা। বাবা হারানো সংসারের হাল ধরতে পড়াশোনায় এগোতে না পারা দুই ছেলে জুম চাষেই খুঁজে নিয়েছিলেন জীবিকা। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে অভাব-অনটনই ছিল নিত্যসঙ্গী। অথচ ছোট মেয়ে রুপনা আর সব মেয়ের মতো হলো না।

বিজ্ঞাপন

সে সারা দিন মেতে থাকে ফুটবলের নেশায়।

প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় নিজ প্রতিষ্ঠানের হয়ে খেলতে যায় বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবলে রাঙামাটি স্টেডিয়ামে। সেখানেই নজর পড়ে ফুটবলপাগল এক শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ানের। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতেই চন্দ্রা তাকে নিয়ে যান তাঁর স্কুলে, বাড়ি থেকে অনেক দূরের ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানেই এক শিক্ষকের বাসায় থেকে পড়াশোনা আর খেলাধুলা রুপনার। বর্তমানে ওই স্কুলের দশম শ্রেণির মানবিকের ছাত্রী সে। ঘাগড়া স্কুলের হয়ে ২০১৬ সালে গ্রীষ্মকালীন ফুটবলে মাধ্যমিকে কলসিন্দুর হাই স্কুলকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় ঘাগড়া স্কুল দলের সদস্য রুপনা। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। জাতীয় দলে প্রায় নিয়মিতই খেলে আসছে ছোটবেলা থেকে গোলবার সামলে রাখা রুপনা। সেই রুপনা এখন চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের গর্বিত সদস্য। প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে হয়েছে আসরে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ নারী ফুটবল গোলরক্ষক। মেয়ের কারণেই আজ ভাঙা কুঁড়েঘরটি পাকা দালান করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঙ্গে মিলেছে বাড়ি যাওয়ার পথের ভাঙা সেতুটিও পাকা করার আশ্বাস।

রুপনা

সত্যিই বাড়ি হচ্ছে আমাদের

খুব ভালো করে বাংলা বলতে পারেন না ষাটোর্ধ্ব কালাসোনা চাকমা। চাকমা ভাষায় তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি এলেই পানিতে ভেসে যায় ঘর, চালের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে। টাকা-পয়সা তো নেই এসব ঠিক করার। মেয়ে যা আয় করে তা দিয়েই তো চলে সংসার। মাত্র কিছুদিন আগে বসতের এই জায়গাটা কিনেছি। এটা এখন আমাদের নিজেদের জায়গা। স্বপ্ন তো ছিলই একদিন বাড়ি হবে কিন্তু কিভাবে হবে জানতাম না। মেয়েই তো সব করে সংসারের। মঙ্গলবার ডিসি স্যার বলে গেলেন, বাড়ি করে দেবেন। ’

নেপথ্যে থাকা চন্দ্রা দেওয়ান

পাহাড়ে যদি কোনো দিন নারী ফুটবলের ইতিহাস লিখতে হয় তবে তিনজন মানুষকে বাদ দিলে সেই ইতিহাস অসমাপ্তই থাকবে। তাঁরা তিনজন হলেন—শিক্ষক বীরসেন চাকমা, কোচ শান্তিমনি চাকমা ও শিক্ষক-অভিভাবক চন্দ্রা দেওয়ান। চন্দ্রা দেওয়ান রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। চ্যাম্পিয়ন জাতীয় ফুটবল দলের চার খেলোয়াড় আনাই মগিনী, আনুচিং মগিনী, রুপনা চাকমা, মনিকা চাকমা তাঁর স্কুলের ছাত্রী। ঋতুপর্ণাও তাঁরই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী।

নিজের ছাত্রী রুপনা চাকমার কথা জিজ্ঞাসা করতেই আপ্লুত চন্দ্রা দেওয়ান বলেন, ‘এখনো চোখে ভাসে সেদিনের ছোট্ট রুপনা। বঙ্গমাতা ফুটবল প্রতিযোগিতায় তাঁর স্কুল থেকে খেলতে আসে। তার খেলা দেখেই তাকে পছন্দ করে ফেলি। তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতেই তাকে ভর্তি করাই আমার স্কুলে, ফ্রিতে পড়াশোনার সুযোগ দিয়ে। তার পরিবারের অবস্থা খারাপ, বাবা নেই। তাই তাকে আমাদেরই এক শিক্ষক নলিনী কুমার চাকমার বাসায় রেখে পড়াশোনা করাই আমরা। ’

 



সাতদিনের সেরা