kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০২২ । ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

তারাগঞ্জে সড়কে মা-নবজাতকের মৃত্যু

নাতিকে নিয়ে আনন্দে দিন কাটানো হলো না

বাবার পথেই প্রাণ গেল অ্যাম্বুল্যান্সচালকের

নীলফামারী ও ডোমার প্রতিনিধি   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘পরিবারে নাতির আগমনে আনন্দে ছিলাম। প্রস্তুতি চলছিল নাম রাখার। ভাবছিলাম নাতিকে নিয়ে বাকি জীবনটা আনন্দে কাটাব। কিন্তু আমার আর সে আনন্দ থাকল না, শখও পূরণ হলো না।

বিজ্ঞাপন

নাম রাখার আগেই আমাদের ছেড়ে বিদায় নিল একমাত্র নাতি। ’

রংপুরের তারাগঞ্জে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের নবজাতকের লাশ বিকেলে দাফনের পর দাদা আমিনুর রহমান (৬০) কান্নায় ভেঙে পড়ে কথাগুলো বলছিলেন। এদিকে একই দুর্ঘটনায় আহত নবজাতকের মা মোসলেমা বেগম (৩৪) মারা গেছে। গত রাত সাড়ে ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (রমেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

আমিনুর রহমান জানান, ৪ সেপ্টেম্বর ডোমারের ডক্টরস ক্লিনিকে সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম হয় ওই নবজাতকের। এরপর শনিবার সন্ধ্যায় কিছুটা অসুস্থ হলে তাকে সেখান থেকে পাঠানো হয় নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে। গতকাল রবিবার ভোরে উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি প্রাইভেট অ্যাম্বুল্যান্সযোগে তাকে নেওয়া হচ্ছিল রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পথে তারগঞ্জে সৈয়দপুরগামী ভাই ভাই ক্লাসিক পরিবহনের বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে দুমড়েমুচড়ে যায় অ্যাম্বুল্যান্সটি। এতে নবজাতক, তার এক খালু ও অ্যাম্বুল্যান্সটির চালক নিহত হন। আহত হয় নবজাতকের মা-বাবাসহ ছয় স্বজন।

বিকেল ৪টার দিকে নবজাতকের লাশ পৌঁছে তার গ্রামের বাড়িতে। এলাকায় নামে শোকের ছায়া। এরপর জানাজা শেষে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে। কিন্তু চিকিৎসাধীন থাকায় নবজাতকের জানাজায় অংশ নিতে পারেনি তার বাবাসহ আহত অন্য স্বজনরা।

বিকেলে রমেক হাসপাতালে নবজাতকের মা-বাবা আহাজারি করছিলেন। বিছানায় পড়ে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ছেলে কোথায়! ছেলেকে ফিরিয়ে দাও আমার বুকে। ’

দুর্ঘটনায় আহত অন্যরা হলেন নবজাতকের মামি দেলোয়ারা আক্তার (৩৪), নানা মশিয়ার রহমান (৬০), নানি অলিমা বেগম (৫৬) ও চাচা আসাদুল ইসলাম (২৪)। তাঁরা রমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বাবার পথেই প্রাণ গেল

অ্যাম্বুল্যান্সটির চালক আল-আমিনের বাবা নাসির উদ্দিনেরও মৃত্যু হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনায়। তিনি পেশায় ছিলেন মাইক্রোবাসচালক। ২৫ বছর আগে আল-আমিনের দুই বছর বয়সে নাসির মাইক্রোবাস নিয়ে সড়কে চলার পথে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান।

প্রতিবেশীরা জানায়, আল-আমিন অতি কষ্টে বড় হয়ে যোগ দেন বাবার ড্রাইভিং পেশায়। তিনি বাবার মতোই অবুঝ দুই ছেলেকে রেখে বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে।

দুপুরে আল-আমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাতম চলছে। তখনো রংপুর থেকে বাড়ি এসে পৌঁছায়নি তাঁর লাশ। তাঁর স্ত্রী লীপা বেগম (২২) স্বামী হারানোর খবরে নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন উঠানে। মায়ের আশপাশে চলাফেরা করলেও দুই ছেলে ঈমান আলী (৬) ও লাবীব মিয়া (২) বুঝতে পারছিল না বাবার চিরপ্রস্থানের বিষয়টি।

ছেলেদের দিকে তাকিয়ে লীপা বিলাপ করে বলছিলেন, ‘মোর দুই ছেলের এলা কী হোবে। কায় ওমাক আদর করিবে? ও আল্লাহ মুই ওমাক এলা কী খাওয়াইম?’

আল-আমিনের সঙ্গে স্ত্রীর শেষ কথা হয়েছিল শনিবার রাত ১০টার দিকে। রাতের খাবার খাওয়ার পর বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘ভাড়া নিয়ে বাইরে যাব, ফিরতে দেরি হবে। ’

আল-আমিনের শাশুড়ি অমিজন বেগম (৫৫) বলেন, ‘ড্রাইভারি করে জামাই আল-আমিন সংসার চালায়। নিজের বাড়ি নাই, থাকে ভাড়ার বাড়িতে। এলা জামাই তো আর নাই, নাতি দুইটাক মানুষ করিবে কায়!’

 

 



সাতদিনের সেরা