kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

রতন সিদ্দিকীর বাড়িতে হামলা

পরিকল্পিত ঘটনা সন্দেহে নিরাপত্তা জোরদার

থানায় মামলা, প্রতিবাদ অব্যাহত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার অধ্যাপক রতন সিদ্দিকীর বাড়িতে হামলার ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে তাঁর স্ত্রী ফাহমিদা হক কলি অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। শুক্রবার থেকেই উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে ৬/এ সড়কে রতন সিদ্দিকীদের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েনসহ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় গাড়ি যাওয়ার সমস্যায় সামান্য কথা-কাটাকাটির জেরে মুসল্লিদের মধ্য থেকে একটি দল ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিয়ে বাড়ির ফটকে হামলা চালায়।

বিজ্ঞাপন

তারা মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি না। রতন সিদ্দিকী ও তাঁর স্ত্রী ফাহমিদা হক পহেলা বৈশাখ উদযাপন এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে যুক্ত আছেন। এসব কারণে উগ্রবাদী কোনো চক্র পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বাড়ির সামনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।

এদিকে রতন সিদ্দিকীর ওপর হামলার প্রতিবাদ ও নিন্দা অব্যাহত আছে। গতকালও বিভিন্ন সংগঠন আলাদা বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ৬/এ রোডে ছয়তলা বাড়িটির বিভিন্ন ফ্ল্যাটে রতন সিদ্দিকী ও তাঁর আত্মীয়স্বজনরাই থাকেন। সেখানে দুজন সদস্য পালাক্রমে বসে পাহারা দিচ্ছেন। ভবনের সামনেই একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কমপ্লেক্সের ভেতরে মসজিদ ও হিফজুল কোরআন মাদরাসা। স্থানীয় একজন পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জুমার নামাজের সময় রাস্তা বন্ধ করে নামাজ হয়। কিন্তু কমপ্লেক্সের মধ্যে একটি স্কুলমাঠ আছে। সেটির গেট বন্ধ থাকে। একজন গাড়ি নিয়ে ঢুকতে সমস্যা হলে একটি রাস্তা ছেড়ে দিলেই তো গাড়ি চলে যায়।

স্কুলের নিরাপত্তাকর্মী রুহুল আমিন বলেন, ‘নামাজের সময় আমরা ভেতরে ছিলাম। বাইরে হৈচৈ শুনেছি তবে আমরা ঘটনা দেখিনি। ’

রতন সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হামলাকারীদের আমরা চিনি না। ওরা নারায়ে তাকবির বলে বাড়ির দিকে ধেয়ে আসে। আমাকেও ফিজিক্যালি অ্যাসোল্ট করেছে। গেট ভাঙার চেষ্টা করে। তারা ‘ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে’ বলে ফেক ব্লেম দেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ, র‌্যাব, ডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। তারা নিরাপত্তাও জোরদার করেছে। ’ সন্দেহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক চেতনার কর্মী। গণজাগরণ মঞ্চের পর আমাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। উত্তরায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির সভাপতি ছিলাম। শোভাযাত্রায় বাধা এসেছিল। আমার স্ত্রী উত্তরায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি। এসব কারণে সন্দেহ হচ্ছে। ’

রতন সিদ্দিকীর স্ত্রী ফাহমিদা হক কলি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। তিনিও একজন লেখক ও নাট্যকার।

প্রতিবাদ অব্যাহত

গতকাল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই ধরনের অবাঞ্ছিত প্ররোচনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্ট করে, সমাজে সম্প্রীতির বিঘ্ন ঘটায়, যা এরই মধ্যে আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সুষ্ঠু তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিতের দাবি জানায়।

এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল, অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিত করা এবং তাঁদের গ্রেপ্তার, কলেজ শিক্ষক উৎপলকে হত্যাসহ শিক্ষাঙ্গনে ধর্মের নামে সংখ্যালঘু শিক্ষকদের টার্গেট করে যে ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে এটা তারই অংশ। ওয়ার্কার্স পার্টি অবিলম্বে রতন সিদ্দিকীর বাড়িতে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এভং সাম্প্রদায়িক প্রচারণা এবং এ ক্ষেত্রে ধর্মকে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সংবিধান ও আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে দাবি করা হয়, অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী ও নড়াইলে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের ওপর হামলায় জড়িতরা মৌলবাদী গোষ্ঠী। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহিন সিকদারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তারা বলেন, এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।



সাতদিনের সেরা