kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

কোম্পানীগঞ্জের আশ্রয়ণ প্রকল্প

১৪০ পরিবার দুর্ভোগে ২২ বছর

► প্রকল্পের ২১০টি ঘরের জায়গায় এখন আছে ১৭০টি ► ঘূর্ণিঝড় ও আগুনে ধ্বংস হয়েছে বাকি ৪০টি ঘর

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

২৯ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১৪০ পরিবার দুর্ভোগে ২২ বছর

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শিমুলতলা আশ্রয়াণ প্রকল্পে বন্যার পানি বাড়ছে। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এ বছর এক মাসের মধ্যে দুই দফা বন্যা। দুইবারই ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়। প্রতিটি ঘর, আসবাব, ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু এবারের নয়, ২২ বছর ধরে কমবেশি একই অবস্থা চলছে।

বিজ্ঞাপন

যে বছর বন্যা বেশি হয়, সেবার দু-তিনবারও বন্যাকবলিত হতে হয়। এবার পানি বেশি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতিও বেশি। জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।

বলা হচ্ছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে শিমুলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের কথা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের একমাত্র বিদ্যালয় ভবনের টিনের ছাদ ছাড়া কিছুই নেই। বেঞ্চ, টেবিলসহ আসবাবের কিছুই অক্ষত নেই।

সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের লাচু খাল থেকে নৌকায় করে ২০ মিনিটের মতো এগোলে দূর থেকে চোখে পড়ে ডুবে থাকা এলাকাটি। ১৯৯৭ সালে এই প্রকল্পের কাজ শুরুর পর ২০০০ সাল থেকে সেখানে মানুষের বসবাস শুরু হয়। প্রকল্পের ২১০টি ঘরের জায়গায় এখন আছে ১৭০টি। ঘূর্ণিঝড় ৩০টি ঘর উড়িয়ে নিয়ে গেছে বিভিন্ন সময়ে। আর ১০টি ঘর আগুনে পুড়ে গেছে। বাসিন্দারা স্থায়ী ঠিকানা পেলেও দুর্ভোগ যেন তাদের নিত্যসঙ্গী।

আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঢোকার সময় কথা হয় জাহাঙ্গীর আলমের (২৭) সঙ্গে। দ্বিতীয় দফা বন্যার শুরুতে তাঁর পরিবার কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, সে ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি। বলেন, ‘১৬ জুন সকাল থেকেই পানি বাড়ছিল। বিকেল ৩টার মধ্যে কোমর সমান পানি হয়ে যায়। তখন আমি নৌকায় পরিবারের সদস্যদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাই। এ সময় সাত বছরের ছোট ভাই আজিজকে ঘর পাহারায় রেখে যাই। ঘণ্টাখানেক পর ফিরে দেখি, ঘরের চাল ছুঁই ছুঁই করছে পানি। দেখেই ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যায়। ’ তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন, ছোট ভাই হয়তো বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও না পেয়ে ঘরের কাছে গিয়ে চিৎকার করে তাকে ডাকতে থাকেন। এ সময় ভেতর থেকে অস্ফুট সাড়া পান। কিন্তু কোনোভাবেই ঘর থেকে বের করতে পারছিলেন না। পরে পাগলের মতো হয়ে ঘরের চাল খুলে ভাইকে উদ্ধার করেন।

জাহাঙ্গীরদের মতোই দুর্ভোগের আলাদা আলাদা গল্প আছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪০টি পরিবারের। আশ্রয়ণে ঢুকেই ডান দিকে চোখে পড়ে, স্ত্রী ও ১২-১৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে ঘরের টিনের ছাদ মেরামতে ব্যস্ত শাহনুর মিয়া। আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে দুই দিন আগে এসেছেন। এর পর থেকেই ঘর ঠিকঠাক করার কাজ করছেন নিজেরা। শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর পয়সা নেই। শাহনুর বললেন, ‘প্রতিবছর বন্যা যাওয়ার পর আমাদের দীর্ঘদিন ধরে ঘরবাড়ি ঠিক করতে হয়। ’

দুই বাড়ি দূরত্বে থাকেন মো. কবির আহমদ। তিনি বলেন, ‘বন্যার সময় পাশে বালুর টিলায় আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম। ওখান থেকে এসেছি দুই দিনও হয়নি, আজ আবার পানি বাড়ছে। ’ বন্যার পানি তাঁর ঘরবাড়ি, আসবাবের ক্ষতি করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ বছর তিন খানি (৯০ শতক) জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। প্রথম দফার বন্যা সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমার ঘরে ধান ছিল না। তবে আটটি গরু আছে। সেগুলোকে বালুর টিলায় অনেক কষ্টে নিয়ে গেছি। এখন গরুর খাবার জোগাড় করব কি, পরিবারের জন্যই খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ’

আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, ১৪০ পরিবারের সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কেউ তিন দিন আগে, কেউ দুই দিন আগে ফিরেছে। সবাই ব্যস্ত ঘরবাড়ি মেরামতে। বিছানাপত্র ঠিকঠাক করছেন নারীরা। এই ব্যস্ততার মধ্যে গতকাল সকাল থেকে আবারও তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে বৃষ্টি। আগের রাত থেকে বৃষ্টি হওয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের উঠানে আবারও পানি উঠেছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত দেড় ফুট পর্যন্ত বেড়েছে পানি।

একমাত্র বিদ্যালয়টি তছনছ

শিমুলতলা আশ্রয়ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চালু হয়। সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এটি উদ্বোধন করে বলেছিলেন, যেভাবেই হোক এটিকে সরকারি করা হবে পরবর্তী সময়ে। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দ্বিজেন ব্যানার্জি যত দিন ছিলেন, তিনি স্কুলের তিন শিক্ষকের জন্য ভাতার ব্যবস্থা চালু রেখেছিলেন।

বিদ্যালয়ের টিনের ছাদ এখনো অক্ষত আছে। তবে দুই পাশের টিনের বেড়া বন্যার পানির তোড়ে ভেসে গেছে। বন্যায় ভেসে গেছে শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিলসহ আসবাব। কিছু রক্ষা করে স্থানীয়রা নিরাপদ স্থানে রেখেছে। গতকাল দেখা গেল, তিনটি বেঞ্চ, একটি টেবিল ও একটি আলমারি ছাড়া আর কিছু স্কুল ভবনে নেই।

প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী আছে ৩৫০ জন। বন্যায় স্কুল বন্ধ দীর্ঘদিন। অনেকের খাতা-বইও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। স্কুলের অনতিদূরে পাওয়া গেল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আজিজকে। সে বলল, ‘ইশকুল খুলব কবে জানি না। আর বন্যায় তো বই-খাতা ভাসিয়া গেছেগি। ’



সাতদিনের সেরা