kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সড়কেই বসত, সংসার

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

২৭ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সড়কেই বসত, সংসার

সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে ধান শুকাচ্ছেন বন্যার্তরা। পাশে ছাপরা ঘরে তাঁদের বসবাস। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে শতাধিক ছাপরা ঘর। এসব ঘরে বানভাসি পরিবারগুলোর বসত। সন্তান-সন্ততি আর পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সংসার পেতেছে তারা। পাশাপাশি বানানো গোয়ালঘরে গরু, বাঁশ-জালের তৈরি খোঁয়াড়ে হাঁসের ঝাঁক।

বিজ্ঞাপন

মাইলের পর মাইল পথে শুকানো হচ্ছে ধান।

গতকাল শনিবার সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত ৬৮ কিলোমিটার সড়ক সরেজমিনে ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।

চলতি বন্যায় সুনামগঞ্জ পুরোটাই ডুবে যায়। সঙ্গে আন্ত জেলা সড়কটিও। তাতে এক সপ্তাহের মতো পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সুনামগঞ্জ। বন্যার পানি সড়ক থেকে নেমে গেছে। তবে এই সড়ক ধরে এগোলে এখনো বন্যার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। সড়কের দুই পাশে নিম্নাঞ্চল এখনো পানিতে টইটুম্বুর। কৃষিজমি, বসতঘর আর হাওর এখনো পানিতে একাকার।

সিলেট নগর ধরে ২২ কিলোমিটার দূরত্বে গোবিন্দগঞ্জ। এর পরই সুনামগঞ্জ সড়ক ধরে এগোতে থাকলে চোখে পড়ে রাস্তার এক পাশে মাইলের পর মাইল সড়কে ধান বিছিয়ে রেখেছে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ। ভেজা ধান পচতে শুরু করায় সড়কে বিছিয়ে দিয়েছে। শিশু-যুবা-বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ ধান নিড়ানিতে হাত লাগাচ্ছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রণশী গ্রামের কাছে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে ধান নিড়ানি দিচ্ছিলেন ইয়ার উদ্দিন। পানিতে ডুবে থাকা নিজের গ্রাম দেখিয়ে বললেন, ‘ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের কয়েকটি ঘর ছাড়া বাকি সব ভেঙে গেছে। এসব বাড়ির বেশির ভাগ ধান হয় ভেসে গেছে, না হয় নষ্ট হয়েছে। ধান শুকানোর মতো কোনো শুকনা জায়গা নেই গ্রামে। তাই আমরা সড়কে ধান নিয়ে এসেছি। ’

ইয়ার আলীর মতো শত শত লোক তাদের ভেজা ধান সড়কে শুকাতে দিয়েছে। ইয়ার আলীকে পেছনে ফেলে সামনে যেতে যেতে একই দৃশ্য মিলল। রাস্তার দুই পাশে কখনো ডান দিকটায় কখনো বাঁ দিকে শুকাতে দেওয়া ধানের সড়ির। গোবিন্দগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ সদরের দূরত্ব ৪৪ কিলোমিটারের মতো। এই দীর্ঘ পথের প্রায় ৮০ শতাংশ অংশে ধান বিছানো। সুনামগঞ্জ সদরে যাওয়ার আগে শান্তিগঞ্জ উপজেলা। স্থানীয় জয়কল ইউনিয়নে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে কথা হয় আসকির আলীর সঙ্গে। রাস্তা থেকে অল্প দূরত্বে নিজের বাড়ির অবস্থান দেখিয়ে বললেন, ‘এখনো হাঁটুপানি আছে ঘরে। বন্যায় ১০ থেকে ১২ মণ ধান ভেসে গেছে। এখন ছয় থেকে সাত মণের মতো আছে। সেগুলো ভিজে খারাপ অবস্থা। চার দিন ধরে সড়কের ওপর ধান শুকাচ্ছি। বাড়ির আশপাশে ধান শুকানোর মতো কোনো শুকনা জমি নেই। ’ শুধু ধান নয়, কোথাও রাস্তা লাল হয়ে ওঠে শুকনা মরিচ বিছানোর কারণে। কেউ বন্যায় নিমজ্জিত ঘরের লেপ-তোশক, আসবাবপত্রও শুকাচ্ছেন কড়া রোদে।

সড়কে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকের বাড়ি বানের তোড়ে ভেঙে ভেসে গেছে। হয়তো টিনের চালটাই মাটিতে পড়ে আছে, বাকি অংশের কোনো অস্তিত্ব নেই। ভেতরের জিনিসপত্র পানিতে ভেসে গেছে। কারো ঘর এখনো তিন-চার হাত ফুট পানির নিচে। এ রকমই একজন আব্দুল করিম। বার্ধক্যে জর্জরিত করিম বলেন, ‘ঘরের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ’

শান্তিগঞ্জ উপজেলার কাছাকাছি সড়কে ঘরের কাছে দাঁড়িয়ে আছিয়া বেগম জানালেন, তাঁর বাড়ি পার্শ্ববর্তী মানিকপুরে। স্বামী মারা গেছেন ছয় বছর আগে। চার মেয়ে ও পাঁচ ছেলে। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি আট সন্তান নিয়ে এমনিতেই অভাবে দিন যায়। এখন সব হারিয়ে দিশাহারা।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জানিগাঁও ইউনিয়ন এলাকায় সড়কে আশ্রয় নেন মিজানুর রহমান। পরিবারের মাথা গোঁজার জন্য ছাপরা ঘর বানিয়েছেন। পাশেই প্রতিবেশীদের নিয়ে গোয়ালঘরের মতো করে বানিয়ে সেখানে রাখা হয়েছে তিন পরিবারের ১৭টি গরু। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৬ জুন রাতে পানি বাড়তে শুরু করে। পরদিন শুক্রবার সকালে ঘরে পানি উঠে যায়। দুপুরের দিকে পানি গলা সমান হয়ে যায়। তখন বাধ্য হয়ে পরিবারসহ ছয়টি গরু নিয়ে ইউনিয়নের তাজপুর গ্রাম থেকে সড়কে এসে এখানে আশ্রয় নিই। ’



সাতদিনের সেরা