kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

শিশুর আকুতি

‘চাচা, আমারে দেইন’

নৌকা দেখলেই ত্রাণের আকুতি নিয়ে হাজির হচ্ছে শত শত মানুষ

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২৫ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘চাচা, আমারে দেইন’

ত্রাণ নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে এসেছে দুর্গতরা। বৃহস্পতিবার বিকেলে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রহমতপুর গ্রামে। ছবি : কালের কণ্ঠ

নদী-হাওর পানিতে একাকার। ডুবে আছে অভ্যন্তরীণ সব সড়ক। তাই নৌকাই এখন প্রধান বাহন। আশ্রয়কেন্দ্রসহ দুর্গত মানুষের কাছে নৌকায় করে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে নৌকা দেখলেই গ্রামের লোকজন তীর থেকে উচ্চৈঃস্বরে আকুতি জানাচ্ছে ত্রাণের জন্য। কিন্তু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় নৌকা ভেড়ানো যায় না। ত্রাণের আকুতিও থামছে না।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামে কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি জানতে পেরে জেলা প্রশাসনের একটি দল এক হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, মোমবাতি, ওরস্যালাইন নিয়ে রওয়া দেয়। নৌকা ভেড়ানোর পর দেখা গেল, গ্রামের প্রধান সড়ক ডুবে আছে। উঁচুতে বানভাসিরা আশ্রয় নিয়েছে। হাজারো বানভাসি ছোট সড়কে দাঁড়িয়েছে ত্রাণের জন্য। সবাই আগে ত্রাণ নিতে চায়। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকায় সবাই জড়ো হয়ে আছে। স্বেচ্ছাসেবী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেক চেষ্টা করেও শৃঙ্খলা ফেরাতে না পেরে এই অবস্থায়ই ত্রাণ বিতরণ শুরু করেন। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ত্রাণ না দিয়েই ফিরে আসেন তাঁরা। পরে সুরমা নদীর অপর পারে এসে নৌকা থেকেই মুড়ারবন্দ, রহমতপুর, রাশনগর গ্রামের মানুষের মধ্যে ঘাটে ঘাটে ত্রাণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়।

রহমতপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় যখন নৌকা ভেড়ানো হয় তখন শতাধিক মানুষ ত্রাণের জন্য ছুটে আসে। এর মধ্যে নারী, পুরুষ ছাড়া শিশুরাও ছিল। ভিড়ে টিকতে না পেরে একটি শিশু গাছে উঠে যায়। গাছে উঠে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. জাকির হোসেনকে বলে, ‘চাচা আমারে দেইন’। এক পর্যায়ে শিশুটির হাতে ত্রাণের প্যাকেট তুলে দেন।

সদর উপজেলার অক্ষয়নগর, উড়াকান্দা ও আমিরপুর গ্রামে ত্রাণ দিতে রওনা দেয় বাংলাদেশ বিজিবি। ঘাট ও নদীর তীর ডুবে আছে। ডুবে যাওয়া বাসাবাড়ি থেকে হাত তুলে ত্রাণের জন্য ডাকছে নারী ও শিশুরা। অক্ষয়নগর গ্রামের শামসুন্নাহার নামের সত্তরোর্ধ্ব এক নারী কাঁপতে কাঁপতে ত্রাণের জন্য ছুটে আসছেন। হেলেদুলে পানিতে পড়ে যাওয়ার অবস্থা তাঁর। ছুটে গিয়ে তাঁকে ধরেন সুনামগঞ্জ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি এক প্যাকেট ত্রাণ তুলে দিয়ে বিজিবি সদস্যকে ডেকে ত্রাণটি ওই নারীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

বৃহস্পতিবার সকালে দোয়ারাবাজার উপজেলার আমবাড়ি বাজার এলাকায় যায় বিআইডাব্লিউটিএর ত্রাণবাহী জাহাজ। এটা দেখে দুই তীরের শত শত নারী-পুরুষ ত্রাণের জন্য ডাকতে শুরু করে। এক পারে নৌকা ভেড়ানোর পর দেখা গেল অপর পার থেকে নৌকা নিয়ে আসছে শত শত মানুষ। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ না থাকায় এলোমেলোভাবেই তাদের হাতে ত্রাণ তুলে দেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সুনামগঞ্জের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘যেসব এলাকায় মানুষ ত্রাণ পাচ্ছে না, আমরা সেসব এলাকায় নৌকা নিয়ে যাওয়ার পর ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ছি। মাঠঘাট ডুবে থাকায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। তাই ত্রাণের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়া বানভাসিদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যেদিকেই যাচ্ছি দেখছি হাত তুলে কাতর সুরে ত্রাণের জন্য ডাকছে তারা। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় নৌকা ভেড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে এই অবস্থার মধ্যেই আমাদের বানভাসিদের ত্রাণ দিতে হচ্ছে। ’

সুনামগঞ্জ-২৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা নিজেদের রেশন দিয়ে প্রথমে রান্না করা খাবার বিতরণ শুরু করি। পরে আমাদের আঞ্চলিক ব্যাটালিয়ন ও হেড কেয়ার্টার থেকেও ত্রাণ পেয়েছি। সেগুলো প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দিতে গিয়ে দেখছি, মানুষ ত্রাণের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। সব গ্রামের মানুষ ত্রাণ চায়। বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এর মধ্যেই আমাদের সতর্ক হয়ে ত্রাণ দিতে হচ্ছে। ’



সাতদিনের সেরা