kalerkantho

সোমবার । ৮ আগস্ট ২০২২ । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯ । ৯ মহররম ১৪৪৪

সংকোচ নিয়ে ত্রাণের লাইনে

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

২৩ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সংকোচ নিয়ে ত্রাণের লাইনে

ত্রাণের অপেক্ষায় বানভাসি লোকজন। গতকাল কিশোরগঞ্জ এলাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভোর থেকে বানভাসি লোকজনের অপেক্ষা। সকালের নাশতাও অনেকের পেটে পড়েনি। কেউ এসেছেন তাঁদের ডুবে যাওয়া বাড়িঘর থেকে; কেউবা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে। গত দুই-তিন দিন ধরে কারো কারো ঘরে রান্না নেই।

বিজ্ঞাপন

চিড়া-মুড়ি খেয়ে কোনো রকমে আছেন। কারো ঘরে আবার তা-ও নেই। যাঁরা কোনো দিন খাবারের জন্য হাত পাতেননি, তাঁরাও সংকোচ নিয়ে ত্রাণের লাইনে।

এই দৃশ্য কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা বাজারের। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাওরে যাওয়ার পথে ত্রাণ দেবেন—এমন খবর শুনে গতকাল বুধবার সকালে এই বাজারে হাজির হয় দুর্গত নারী-পুরুষরা।

উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের সাগুলি গ্রামের বৃদ্ধা নারী বেগম (৭০)। এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য তাঁকে খবর দিয়ে এনেছেন। খবর পেয়ে নাতিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বন্যার প্রথম ধাক্কায় তাঁর বাড়িটি ডুবে গেছে। ১২ জনের বড় পরিবার নিয়ে তিনি উঠেছেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। তিন ছেলে মাছ ধরার কাজ করতেন। নৌকা ভেঙে যাওয়ায় আয়-রোজগার বন্ধ। আশ্রয় জুটলেও খাদ্যের সংকট। দিনে এক-দুই বেলা সামান্য কিছু খেতে পারছেন। তাই ত্রাণের আশায় বাজারে বসে আছেন তিনি।

বালিয়াপাড়ার কৃষক জাহাঙ্গীর (৫২)। তাঁর ঘরে কোমর সমান পানি। তাই ঘরে মাচা তৈরি করেছেন। ছয়জনের পরিবার নিয়ে সেখানেই গাদাগাদি করে থাকছেন। গবাদি পশুগুলো অন্য এলাকায় রেখেছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ার কারণ হিসেবে বললেন, ‘বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে আরো ক্ষতি হবে। ঘরে যা আছে, চুরি হয়ে যাবে। এই ভয়ে বাড়ি ছাড়ছেন না তিনি। ’

তবে বালিয়াপাড়ার ছমির উদ্দিন (৬৫) ও জনু মিয়া (৫৫) আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। ঘর থেকে কিছু বের করতে পারেননি। পরিবারের লোকজন নিয়ে ভিজা কাপড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের ওপর নির্ভর করেই গত কয়েক দিন ধরে আছেন তিনি। সামনের দিনগুলো কিভাবে কাটবে—এই চিন্তায় মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তাঁরা।

গতকাল সকালে বানভাসি এই সব লোকের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় জেলা প্রশাসন। উপস্থিত প্রত্যেককে ১০ কেজি চাল, এক কেজি ডাল, এক লিটার তেল, লবণ ও চিনি বিতরণ করা হয়। এ সময় ত্রাণ নিতে আসা লোকজনকে ধৈর্য ও সাহস নিয়ে বন্যা মোকাবেলার আহ্বান জানান ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান। তাঁদের অভয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভব সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে, যেন তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ’

ত্রাণ বিতরণকালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম, করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পলাশ কুমার বসু, পিআইও স্বপন মাতুব্বর ও স্থানীয় চেয়ারম্যান কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এবারের বন্যায় সেখানে লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৯টি উপজেলার ৬৪টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত। বন্যাদুর্গতদের জন্য জেলাজুড়ে ২৫৯টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে ১৩ হাজার ৯ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিতদের জন্য ১৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া দুই হাজার ৪০০ প্যাকেট শুকনা খাবার পাঠানো হয়েছে।



সাতদিনের সেরা