kalerkantho

শনিবার । ২৬ নভেম্বর ২০২২ । ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্রদর্শনী

ভাস্কর্যে গণহত্যার নির্মম চিত্র

সালেহ ফুয়াদ   

২১ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাস্কর্যে গণহত্যার নির্মম চিত্র

একাত্তরের গণহত্যা, নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নিয়ে জাতীয় জাদুঘরে গতকাল সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। ছবি : শেখ হাসান

দুটি উঁচু খুঁটির সঙ্গে উল্টো করে বাঁধা দুজন মানুষ। বুক থেকে মাথা পর্যন্ত মাটির নিচে পোঁতা। মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্মম এই নির্যাতনের দৃশ্য ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী রবিউল ইসলাম। তাঁর আরেকটি ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে, রাজাকার-আলবদর ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা এক বাঙালি সন্তানকে চিত করে শুইয়ে জবাই করছে।

বিজ্ঞাপন

স্টোনওয়্যারে নির্মিত ভাস্কর্যটির নাম দিয়েছেন শিল্পী ‘রক্তস্নাত কসাইখানা’। শিল্পী রেহানা ইয়াসমিন ‘নারীর হাহাকার’ ভাস্কর্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত নারীর দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন, এ দৃশ্য যে কাউকে ভারাক্রান্ত করে তুলবে।

রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী কক্ষে একাত্তরের গণহত্যা ও নির্যাতনের এমন ৩৮টি ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়ে গেল গতকাল শুক্রবার। ভাস্কর রেহানা ইয়াসমিন, রবিউল ইসলাম, ফারজানা ইসলাম মিলকি, মুক্তি ভৌমিক ও সিগমা হক অংকন গণহত্যা জাদুঘরের অধীনে পরিচালিত গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণাকেন্দ্রের ফেলোশিপের আওতায় ভাস্কর্যগুলো নির্মাণ করেছেন। অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল ‘গণহত্যা ১৯৭১ : পঞ্চ-ভাস্করের যাত্রা’ শীর্ষক এই ভাস্কর্য প্রদর্শনী ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গণহত্যা জাদুঘর। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। গণহত্যা জাদুঘরের সভাপতি ও লেখক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে এ আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান।

‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ সূত্রে জানা যায়, গণহত্যাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করে গণহত্যার ইতিহাস সংরক্ষণ ও গবেষণা করার লক্ষ্যে গণহত্যা জাদুঘর ২০১৪ সালের ১৭ মে যাত্রা শুরু করে। বহু গবেষণামূলক ও সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে এ বছর আট বছর পূর্ণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গণহত্যা জাদুঘর নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সপ্তাহব্যাপী ভাস্কর্য প্রদর্শনী তার একটি। প্রদর্শনীতে পাঁচজন ভাস্করের মোট ৩৬টি ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে। এর বাইরে গণহত্যা জাদুঘরের সভাপতি ও লেখক মুনতাসীর মামুনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে শিল্পী হামিদুজ্জামানের ‘গণহত্যা’ এবং শিল্পী রোকেয়া সুলতানার ‘শহীদ সন্তান কোলে মা’ ভাস্কর্য দুটিও প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। গণহত্যা জাদুঘরের অধীনে পরিচালিত গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণাকেন্দ্রের ফেলোশিপের আওতায় নির্মিত ভাস্কর্যগুলো পিতল, অ্যালুমিনিয়াম, স্টোনওয়্যার, টেরাকোটা ও মিশ্র মাধ্যমে সৃষ্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ভাস্কর রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমিসহ পাঁচজন শিল্পীকে ভাস্কর্যের মাধ্যমে একাত্তরের গণহত্যা ও নির্যাতনের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। এ ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আলোকচিত্রে আমরা গণহত্যার যে চিত্র পেয়েছি তা-ই তুলে এনেছি। ’ 

কে এম খালিদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘ভাস্কর্য শুধু সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহনও বটে। মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে এই ভূখণ্ডের মানুষের কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই যুদ্ধ শুধুই বিজয়ের ইতিহাস নয়, গণহত্যা ও নিপীড়নের ইতিহাসও। যুদ্ধকালীন নানা ঘটনা, গণহত্যা, নির্যাতন, নারী নিপীড়ন ও অনুভূতিকে কেন্দ্র করে পাঁচজন ভাস্কর এই ভাস্কর্যগুলো নির্মাণ করেছেন। এমন এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য গণহত্যা জাদুঘরকে ধন্যবাদ। ’

শিল্পী হাশেম খান বলেন, ‘আমরা শুধু আমাদের বিজয়ের কথা বলি। কিন্তু এ বিজয়ের পেছনে যে কত মানুষের কান্না রয়েছে; তাদের কথা স্মরণ করি না। আজ নতুন একটি শিল্পমাধ্যমে গণহত্যার কথা তুলে ধরা হলো। আমাদের তরুণতুর্কিরা তাঁদের জানা ইতিহাসমতো শিল্প সৃষ্টি করেছেন। দেশের জন্য শিল্পকলার বড় সংযোগ এটি। শুধু শিল্পের জন্য শিল্প নয়; যুদ্ধ-যন্ত্রণা এবং এ দেশের মানুষের কথা শিল্পের মাধ্যমে আমাদের জানাতে হবে। এই চেতনা নিয়েই শিল্পীদের কাজ করতে হবে। ’

মুনতাসীর মামুন গণহত্যা জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প বলেন। প্রদর্শনী সম্পর্কে বলেন, ‘পঞ্চ-ভাস্কর নির্বস্তুকতার পথে হাঁটেননি, দর্শকদের সঙ্গে যাতে যোগাযোগ করা যায় তাই এমন বিন্যাস বা গঠন বেছে নিয়েছেন, যা দর্শকদের কাছে অচেনা ঠেকবে না। আমার মনে হয়েছে, প্রদর্শিত ভাস্কর্যগুলো দেখলে দর্শকরা ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও নির্যাতনের বেদনা মর্মে মর্মে অনুভব করবেন। ’

আয়োজনের শুরুতে চুকনগর গণহত্যার ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর সদ্যঃপ্রয়াত লেখক ও সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এবং চুকনগর গণহত্যায় শাহাদাতবরণকারীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

‘গণহত্যা ১৯৭১ : পঞ্চ-ভাস্করের যাত্রা’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৭ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখা যাবে।  



সাতদিনের সেরা