kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

জরিমানা করা ড্রেজারেই চলছে বালু উত্তোলন

কিশোরগঞ্জের হাওর

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কৃষিজমি ভরাটের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কিশোরগঞ্জের হাওরে জমি ভরাট থেমে নেই। দিন দিন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বালু কারবারিরা। তাঁরা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা মানছেনই না। আটক বা জরিমানা করার পরপরই ফের ড্রেজার বসিয়ে তুলছেন বালু।

বিজ্ঞাপন

হাওরাঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলেশ্বরী, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদীতে পাঁচটি ড্রেজার বসিয়ে দিন-রাত চলছে বালু উত্তোলন। এতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

বাজিতপুরের হুমাইপুরের উজাইখালী গ্রামের পাশের অন্তত ৩০০ শতাংশ বোরো জমি প্রকাশ্যে ভরাট করে ফেলছেন প্রভাবশালীরা। উপজেলা প্রশাসনের আটক করে ছেড়ে দেওয়া ড্রেজারেই তোলা হচ্ছে এই বালু। এ ছাড়া অষ্টগ্রামের আদমপুর ইউনিয়নের গাজীরহাটি এলাকায় কুশিয়ারা নদীতে দুটি ও বাংগালপাড়ায় মেঘনা নদীতে একটি ড্রেজারে দিন-রাত তোলা হচ্ছে বালু।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লাখ লাখ ঘনফুট অবৈধ বালু শতাধিক বাল্কহেড স্টিলবডি নৌযানে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার অবৈধ বালুর কারবার চলছে অনেকটা ফ্রি স্টাইলেই।

অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাইদুল ইসলাম সম্প্রতি বাংগালপাড়ার ড্রেজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার সময় জনসমক্ষে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার ঘোষণা দেন। পরে অল্প টাকা জরিমানা করা হয় বলে খবর রটে। এখনো সেই ড্রেজার দিয়েই তোলা হচ্ছে বালু।

সরেজমিনে গতকাল শুক্রবার হুমাইপুর হাওরে গিয়ে দেখা যায়, অবাধে ফসলি জমি ভরাট করার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চারপাশের আরো ২০-৩০ একর জমি। উজাইখালী গ্রামের কয়েকটি পরিবারের এসব জমি ভরাট করতে গিয়ে সামনের খালের একাংশ দখল করে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানায়, জায়গাটি ভরাট করে ফেলা হলে আশপাশের হাওরের অন্তত ২০০ একর জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেবে। হুমাইপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের নিচু এলাকার পানি না সরায় ধান মাড়াইয়ের খালগুলো তলিয়ে যাবে। ফলে ধান তুলতে গিয়ে কৃষকদের পড়তে হবে মহাবিপাকে। এসব নিয়ে গ্রামবাসী ভেতরে ভেতরে ফুঁসলেও মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বালুখেকোরা প্রশাসনের সঙ্গে রীতিমতো ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলায় মেতে উঠেছে। গত ১২ জানুয়ারি বাজিতপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের একটি দল হুমাইপুর নদীর ঘাটে বালু সরবরাহ করার কাজে নিয়োজিত ড্রেজারের চারজন শ্রমিককে আটক করে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা না নিয়েই ছেড়ে দেয়। এখন সেই ড্রেজারেই বালু ফেলা হচ্ছে।

একই সময় বাজিতপুরের মাইজচর ইউনিয়নের আয়নারগোপ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাজিতপুর ও অষ্টগ্রামের সীমানার মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলেশ্বরী নদীতে দুটি লোড ড্রেজারে বালু তোলা হচ্ছে। পাশের জমির মালিকরা বলেন, বালু তোলায় তাঁদের বোরো জমি ধসে পড়ছে। জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে না পেরে পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোশতাক আহমেদ কমলের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ধলেশ্বরী নদীর ওই দুটি ড্রেজার চলছে। তা ছাড়া বাংগালপাড়ার ড্রেজারটিও তাঁরই। এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর বাংগালপাড়ার ড্রেজারটি আটক করে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা ঘোষণা করা হয়। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরে জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়। এখন সেই ড্রেজারটিও সচল।

এ ব্যাপারে অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোশতাক আহমেদ কমল বলেন, ‘রাস্তায় বালু ফেলার প্রয়োজনে বাংগালপাড়ার ড্রেজারটি চালানো হচ্ছে। প্রশাসন ভুলবশত জরিমানা করেছিল। ’ ধলেশ্বরী নদীতে বসানো দুটি ড্রেজারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নদীগুলোতে চর পড়ে যাচ্ছে। নদী থেকে বালু তুললে সমস্যা কী! এতে কেউ তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না!’ 

অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনরত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘বাংগালপাড়ার ড্রেজারকে পাঁচ লাখ নয়, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। ’ সেই ড্রেজার এখনো কিভাবে সচল রয়েছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ড্রেজার সম্পূর্ণ অবৈধ। কোনোভাবেই এসব চলতে পারে না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। ’

বাজিতপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইশরাত জাহান বলেন, ‘হুমাইপুরের উজাইখালী গ্রাম থেকে আনলোড ড্রেজারের চার কর্মীকে আটক করা হয়েছিল। এ রকম ড্রেজারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তাই আটকদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ’



সাতদিনের সেরা