kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

৫ বছরেও শুরু হয়নি কাজ

মুস্তফা নঈম, চট্টগ্রাম   

২২ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাঁচ বছরেও চট্টগ্রাম-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ নৌপথের খননকাজ (ড্রেজিং) শুরু করতে পারেনি অভ্যন্তরীণ নৌপরিবরহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)। এতে এই নৌপথে নৌযান চলাচল দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার আট বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের আওতায় খননকাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালে। এরই মধ্যে মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর বিআইডাব্লিউটিএর জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে (রিভার রিপোর্ট) ওই নৌপথে ১৪টি পয়েন্টে জোয়ারের সময় সাবধানে জাহাজ চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যোগ্য দরপত্রদাতার অভাবে পাঁচ বছরেও শুরু করা সম্ভব হয়নি চট্টগ্রাম-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-আশুগঞ্জ নৌপথের খনন। একবার দরপত্র আহবান করা হলেও প্রায় ৯০০ কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিং করার মতো সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, ওই নৌপথে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হয়, যা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারা দেশে পরিবহন হওয়া পণ্যের ৭০ শতাংশ। দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পানগাঁও হয়ে ঢাকা-আশুগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথ ৮৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে প্রায় ৮০ কিলোমিটার অংশ বঙ্গোপসাগরে। ডুবোচরের কারণে সন্দ্বীপের পশ্চিমে ভাসানচরের দক্ষিণে পানির গভীরতা কমে এসেছে আড়াই থেকে ছয় মিটারে। এই অংশ জাহাজ চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ায় ২০১৯ সালের এপ্রিলে পথ সরিয়ে নেওয়া হয় ভাসানচরের দক্ষিণে জেগে ওঠা  ঠেঙ্গারচর নামে পরিচিতি পাওয়া আরেকটি নতুন চরের পরে। এটি বর্তমান পথ থেকে তিন কিলোমিটার গভীর সমুদ্রের দিকে। নতুন পথে ভাটার সময় গড় গভীরতা চার মিটারের কাছাকাছি। জোয়ারের সময় গভীরতা থাকে সাত মিটারের কাছাকাছি। তবে নৌপথটির কমপক্ষে এক কিলোমিটার অংশে নাব্যতা কম। এ জন্য জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সরকার দেশের নৌপথ নির্বিঘ্ন রাখতে ড্রেজিংয়ের জন্য হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। নদীপথ ড্রেজিং হচ্ছে কিন্তু নদীর নাব্যতা বাড়ছে না।

চট্টগ্রাম বন্দরসংশ্লিষ্ট নৌপথের নাব্যতার বিষয়ে লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাস্টার নবী আলম বলেন, সন্দ্বীপ অংশের নতুন রুটের কোনো কোনো এলাকায় পানির গভীরতা ভাটার সময় তিন মিটারের কাছাকাছি। সর্বোচ্চ উচ্চতার জোয়ার ছাড়া ওই এলাকা অতিক্রম করা সম্ভব না। এ ছাড়া সেখানে সমুদ্র তুলনামূলক বেশি উত্তাল হওয়ায় জাহাজ চালানোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

বিআইডাব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফিক বিভাগের নদীপথের সর্বশেষ জরিপের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম চরগজারিয়া ভায়া ভাসানচর, চট্টগ্রাম চরগজারিয়া ভায়া সন্দ্বীপ, চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর জনতাবাজার, ভোলার ইলিশা চররমনী লক্ষ্মীপুর ফেরিঘাট, চাঁদপুর চরআলেকজান্ডার, হুজুরের চরসহ ১৪টি পয়েন্টে জোয়ারের সুবিধা নিয়ে বিআইডাব্লিউটিএর অভিজ্ঞ পাইলটের সহায়তায় জাহাজ চালাতে হবে।

প্রকল্পটির পরিচালক মাহামুদ হাসান সেলিম। তিনি বিআইডাব্লিউটিএর প্ল্যানিং বিভাগের পরিচালক। তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে দুই দফায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ড্রেজিং সংস্থাগুলোর সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনসালট্যান্স কনফারেন্স করা হয়। এতে নেদারল্যান্ডস, চীন, ভারত, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। প্রথম দফায় আহবান করা দরপত্র বাতিল করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয়বার দরপত্র আহবান করা হয়। এতেও দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়।

মাহামুদ হাসান বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০১৬ সালে দরপত্র আহবান করা হয়। সেই সময় ২৩টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ফরম সংগ্রহ করে। ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। দরপত্র জমাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতাবিষয়ক কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ছয়টি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। পরবর্তী সময়ে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান তাদের চূড়ান্ত কাগজপত্র জমা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে ২২টি শাখা রুটসহ প্রায় ৯০০ কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিং করার মতো সক্ষম নয়, এই বিবেচনায় প্রথমবার আহবান করা দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পুরো প্রকল্পকে তিনটি স্লটে ভাগ করে আবারও দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের টেকনিক্যাল বিষয় অনুমোদনের জন্য বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। দুটি প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া গেছে। সেগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একটি প্রকল্পের অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, আট বছর মেয়াদের এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ৮ জুলাই। পরে প্রকল্পের সময়সীমা আরো এক বছর বাড়ানো হয়।

লাইটারেজ শ্রমিকরা জানান, লক্ষ্মীপুর মজু চৌধুরীর ঘাট এলাকা ও নোয়াখালী রায়পুর বিরবিরচর এলাকার নৌপথের প্রায় চার কিলোমিটার পথ ঝুঁকিপূর্ণ। এই এলাকায় ছোট ছোট বহু ডুবোচর রয়েছে। দুই-তিন বছর আগে জাহাজের মাস্টাররা নিরাপদে জাহাজ চালানোর জন্য নিজেরা নতুন একটি পথ চালু করেন।



সাতদিনের সেরা