kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

১০ ভরি সোনায় আমদানি শুল্ক ২০ হাজার টাকা

শাহ আমানতে পাচার হয় চার হাজার টাকা আঁতাতে

♦ দুবাই থেকে পাঠায় হারুন ও মোরশেদ
♦ বাহক মো. সোহেল
♦ চট্টগ্রামে গ্রহণ করে সফিকুর রহমান চক্র
♦ যোগসাজশে কাস্টমসের সিপাহি রনি ও হানিফ

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বৈধভাবে দেশে ১০ ভরি সোনার একটি বার আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। আর বিমানবন্দরে অবৈধ পথে আঁতাত করে চার হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পাচার করা যায় এই পরিমাণ সোনা। কিছু অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা এবং শুল্ক গোয়েন্দাদের যোগসাজশে এভাবে পাচার হচ্ছে বিপুল পরিমাণ সোনা। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে এ রকম একাধিক পাচারকারী চক্র সক্রিয়। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে একটি চক্রকে শনাক্ত করা গেছে।

গত ২৩ নভেম্বর শাহ আমানত বিমানবন্দরে চার কেজি সোনার ২৬টি বারসহ মো. সোহেল নামের এক ব্যক্তিকে আটকের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ওই দিন বিমানবন্দরে দায়িত্বরত একটি গোয়েন্দা সংস্থা সোহেলকে আটক করে। বিজি ১৪৮ নম্বর ফ্লাইটটি সকাল ৮টায় অবতরণের পর যাত্রীরা বেল্টে যান লাগেজ সংগ্রহ করতে। সোহেল সেখানে সন্দেহজনকভাবে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলেন। এতে সন্দেহ হলে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীরা তাঁকে চ্যালেঞ্জ করে ২৬টি সোনার বার জব্দ করে। এর পর কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেলের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শরীফুর রহমান মামলা করেন। সোহেল চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা। হাশেম নামের এক বন্ধু তাঁকে সোনার বারগুলো দিয়েছেন বলে সোহেল জানান। সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিন রিমান্ডে নিলেও বাড়তি আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুবাই থেকে সোনার বারগুলো পাঠিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর এলাকার এস এম ইস্রাফিলের ছেলে হারুন উর রশিদ। হারুন পর্যায়ক্রমে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় অবস্থান নিয়ে সোনা পাচার করেন। বর্তমানে হারুন দুবাই অবস্থান করছেন।

সোহেলকে হারুন সোনার বার ও আইফোন দেন চট্টগ্রামে নিয়ে আসতে। এ জন্য সোহেল পেয়েছেন বিমানের টিকিটসহ ৪০ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে নির্বিঘ্নে চালানটি বের করে দিতে পাচারকারীরা আঁতাত করে কাস্টমসের সিপাহি রনির সঙ্গে। রনি তাঁর সহকর্মী হানিফকে দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে চালানটি বের করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চালানটি বিমান বন্দরে জব্দ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে রনি এই চক্রটিকে সহযোগিতা করে আসছিলেন।

বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে সোনার চালানটি যাওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রাম রিয়াজউদ্দিন বাজারের মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সফিকুর রহমানের কাছে। সেখানকার ব্যবসায়ীরা তাঁকে শীর্ষ সোনা পাচারকারী হিসেবে জানেন। তাঁর সঙ্গে আছেন মনজুর আলম, ইয়াছিন কবির, দোকানের কর্মী কাম অংশীদার মিজান রহমান প্রকাশ জাস্টিন, ফোরকান ও মোরশেদ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুবাই থেকে হারুন ও মোরশেদ চক্র সোনার বার পাঠানোর আগে চট্টগ্রামে সফিক চক্র কাস্টমসের সিপাহি রনি ও হানিফের সঙ্গে আঁতাত করে। ওই দিন সফিক তাঁর সহযোগীসহ বিমানবন্দরের বাইরে অবস্থান করছিলেন। ভেতরে সোহেল আটক হওয়ার খবরে সটকে পড়েন তিনি। পরে সোহেলকে রিমান্ডে নিলে চক্রের সদস্যদের পরিচয় শনাক্ত করতে যেন তাঁকে চাপ দেওয়া না হয় সে জন্য পতেঙ্গা থানা পুলিশকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

দুবাই ও মালয়েশিয়ায় বসে সোনা পাচার করছেন কি না জানতে চাইলে দুবাই থেকে হারুন উর রশিদ বলেন, ‘আমি দুবাই-মালয়েশিয়ায় কী করি, সেটা সবাই জানে। আমি সোনা পাচারকারী নই। আপনি কেন দেশে বসে এসব জানতে চাইছেন?’

একইভাবে রিয়াজউদ্দিন বাজারের পাচারকারী চক্রের নেতা সফিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সোনা পাচার করি না। ২৩ নভেম্বর সাতকানিয়ায় গ্রামের বাড়িতে ছিলাম।’

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর কাস্টমসের উপকমিশনার সুমন চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাস্টমস বিভাগের কেউ সোনা পাচারকারীদের সহযোগিতা দিচ্ছে, এ কথা সত্য নয়। পাচারকারীদের ধরছে বলেই এত অবৈধ সোনা ধরা পড়ছে।’

সিপাহি রনি ও হানিফের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রনিকে গত এপ্রিল মাসে এবং হানিফকে গত রবিবার কাস্টমসের নিলাম শাখায় বদলি করা হয়েছে। তাঁরা সোনা পাচারকারীদের সহযোগিতা করেছেন—এমন অভিযোগ কেউ লিখিতভাবে দিলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযুক্ত সিপাহি রনির মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। আর হানিফ ফোন রিসিভ করলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।



সাতদিনের সেরা