kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

স্কুলের জায়গা দখল করে ভবন

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২৮ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্কুলের জায়গা দখল করে ভবন

রাজশাহী নগরীর গোরহাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজশাহী নগরীর তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা দখল করে নিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। কোনোভাবেই জায়গা দখলমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। দখলের কারণে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে বিদ্যালয়ের সম্মুখভাগ। এতে অ্যাসেম্বলি ও খেলাধুলা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই হুমকি দেওয়া হচ্ছে শিক্ষকদের। বিদ্যালয়গুলো হচ্ছে—গৌরহাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কৃষ্ণকান্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মন্নজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর গৌরহাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটি বহুতল ভবন। ভবনটির কারণে বিদ্যালয়ের প্রাচীরটিও দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি বিদ্যালয়ের প্রবেশপথটিতেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি। বিদ্যালয়ের গা ঘেঁষে গড়ে তোলা এই ভবনের মালিক আব্দুল গফুর। তিনি একসময় রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তরে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে ভবনের সামনের খাস জায়গাটিও তিনি নিজের নামে করে নিয়েছেন। এখন তাঁর ছেলে নাইম ইসলাম জায়গাটির মালিক। বিদ্যালয়টির পশ্চিম পাশের টয়লেটের সামনে প্রাচীর ভেদ করে ঢুকে গেছে আরেকটি তিনতলা ভবন। এর মালিক স্থানীয় হানিফ উদ্দিন। দুটি ভবনের ছাদের পানিও বিদ্যালয়ের ভেতরে এসে পড়ে।

এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রেজিনা খাতুন বসেছিলেন বিদ্যালয়ের সামনে গড়ে তোলা ভবনের পাশে রাখা একটি বেঞ্চে। তিনি বলেন, ‘এখানে অভিভাবকরা এলেও ঠিকমতো বসার জায়গা পান না। আর শিক্ষার্থীরা তো খেলাধুলার পরিবেশ পায়ই না। ’

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সামাউল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত ও শরীরচর্চা করানোর জায়গাও রাখেনি দখলদাররা। অথচ এই স্কুলেই আমি পড়ালেখা করেছি। তখন অনেক শিক্ষার্থী ছিল। এখন মাত্র ১২৩ জন শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের সামনের খাস জায়গা সব দখল হয়ে গেছে। একজনের দান করা মাত্র পাঁচ কাঠা জায়গার ওপর কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যালয়টি। পাশের ভবন মালিকরা এক হাত জায়গাও ছাড় দেননি। জায়গা না থাকায় শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা কিংবা দৌড়াদৌড়িও করতে পারে না। এ কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছেই। ’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিদা আক্তার বলেন, ‘শুনেছি, আগে আশপাশ ও সামনের অংশ সব স্কুলেরই ছিল। পরে কিভাবে এসব দখল হয়ে ভবন গড়ে উঠেছে, তা বলতে পারব না। ’ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলাউদ্দিন বলেন, ‘যেসব ভবন গড়ে উঠেছে, সেগুলো স্কুলের জমিই ছিল। কিন্তু ভবন মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এসব দখল করেছে। আমরা বিভিন্ন সময় বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। ’ তবে দুটি ভবনের মালিকই দাবি করেছেন, তাঁরা যে ভবন গড়ে তুলেছেন, সেটি তাঁদের নিজেদের জায়গা। স্কুলের জায়গায় তাঁরা ভবন গড়ে তোলেননি।

এদিকে নগরীর বেলদারপাড়া এলাকায় কৃষ্ণকান্ত সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে গড়ে তোলা হয় পূজার প্যান্ডেল। এ কারণে সেখানে ঠিকমতো খেলাধুলা করতে পারে না শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘স্কুলের জায়গায় রাত-দিন আড্ডা বসে। এ নিয়ে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না। ’

অন্যদিকে নগরীর মন্নজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পাশের জায়গা দখল করে হিরা নামের এক ব্যক্তি গড়ে তুলেছেন সুউচ্চ ভবন। দুই বছর আগে গড়ে তোলা এই ভবন নির্মাণের সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একাধিকবার স্থানীয় থানা থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছেন। এতেও কোনো লাভ হয়নি। প্রভাবশালীর থাবায় বিদ্যালয়ের ভেতরে চলে এসেছে ভবনের একটি অংশ।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কুমকুম ইয়াসমিন বলেন, ‘এ ব্যাপারে বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো আমাদেরই নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ’ তবে ভবনের মালিক হিরা ইসলাম বলেন, ‘আমি আমার জায়গায়ই বাড়ি করেছি। স্কুলের জায়গায় বাড়ি করার প্রশ্নই আসে না। ’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালাম বলেন, ‘নগরীর অন্তত তিনটি স্কুলের অনেক জায়গা দখল হয়ে গেছে। প্রভাবশালীদের কারণে আমরা এ দখল ঠেকাতে পারিনি। এ কারণে এসব স্কুলে শিক্ষার পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিনোদনের সুযোগও হারিয়েছে। এখন বড় ধরনের পদক্ষেপ ছাড়া এসব জায়গা দখলমুক্ত করা সম্ভব নয়। ’ 



সাতদিনের সেরা