kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

সশস্ত্র সংঘাতে ধূসর পর্যটন

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

২৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সশস্ত্র সংঘাতে ধূসর পর্যটন

ঘন সবুজ অরণ্য। কান পাতলেই মাঝেমধ্যে ভেসে আসত বাঘের গর্জন। পাহাড়ের বুক ফুঁড়ে কোথাও কোথাও বইত ছড়া। বাঘ আর পাহাড়ি ছড়ার সন্ধিতে নামটা ‘বাঘাইছড়ি’। রাঙামাটির বাঘাইছড়িই আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা। পাহাড়ের চার আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র অস্ত্রবাজদের প্রধান ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবেও এই উপজেলার দারুণ নামডাক! ইতিহাস বলছে, ভ্রাতৃঘাতী হাঙ্গামায় পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণ ঝরেছে এই বাঘাইছড়িতে। এ কারণে মাঝেমধ্যেই বাঘাইছড়ি হয়ে ওঠে গণমাধ্যমের শিরোনাম। সূত্র বলছে, গত ১০ বছরে এই উপজেলায় শুধু জনসংহতি সমিতিরই (এমএন লারমা) ২৮ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য পর্বতকন্যা সাজেক। বাঘাইছড়িতে অবস্থিত নয়নাভিরাম এই ইউনিয়নকে অনেকেই মনে করেন ‘বাংলাদেশের দার্জিলিং’। সেখানে গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও হোটেল। সাজেক ঘিরে সম্প্রসারিত সম্ভাবনাময় পাহাড়ের পর্যটন। কিন্তু বাঘাইছড়িতে একের পর এক সহিংসতার ঘটনায় প্রভাব পড়ছে সাজেককেন্দ্রিক পর্যটনেও। মানুষ ভয়ের মধ্যেও সাজেক যাচ্ছে—কারণ সেখানে যাওয়া-আসার কাজটি পুরোটাই হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিশেষ প্রহরায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিপুল সম্ভাবনাময় সাজেকের পর্যটনও ঝুঁকিতে পড়েছে সশস্ত্র সংঘাতে।

ভয়ের নাম বাঘাইছড়ি : রাঙামাটি থেকে নৌপথে আর খাগড়াছড়ি থেকে সড়কপথে যোগাযোগের এই উপজেলাটি দেশের সবচেয়ে দুর্গম। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের মতো এখানকার রাজনীতিও বেশ সর্পিল। এখানে উত্থান-পতন আর বাঁকবদল হয় নিমেষেই। আলোচিত হত্যাসহ বেশ কয়েকটি গ্রুপ কিলিং হয়েছে এই উপজেলায়। সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থেকেও নিজের কাছেও লাইসেন্সধারী অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করতে হয় এই উপজেলার নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে। ফলে বাঘাইছড়ি দৃশ্যত ভয়েরই এক জনপদ।

সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য : বাঘাইছড়ির সঙ্গে লাগোয়া ভারতের দুই রাজ্য ত্রিপুরা ও মিজোরাম। সেই সীমান্তের বড় একটি অংশ দুর্গম হওয়ায় ওই এলাকা অনেকটাই অরক্ষিত। ফলে এই অঞ্চলে সশস্ত্র তৎপরতায় নিয়োজিত আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলা। গভীর বনঘেরা এই উপজেলায় সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আত্মগোপনে থাকার জায়গা বিস্তর। আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে পালানোর সুযোগও অবারিত। ফলে এই উপজেলা চারটি আঞ্চলিক দলের কাছেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সশস্ত্র তৎপরতার কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কখনো অভিযানে নামলে গভীর জঙ্গলে আত্মগোপনে থেকে পরে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সুযোগ থাকায় বাঘাইছড়িই হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে ফিরে আসার সময় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা সাত নির্বাচনী কর্মীকে হত্যার পরও দ্রুতই দুর্গম বনে চলে যায় হামলাকারীরা। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যাপক অভিযানেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

কার নিয়ন্ত্রণে বাঘাইছড়ি : পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে যে বিরোধ, তার যতটা না আদর্শের, তার চেয়ে বেশি আধিপত্যের। তবে বাঘাইছড়ির একক নিয়ন্ত্রণ কারোর হাতেই নেই। উপজেলার ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সারোয়াতলী ও বাঘাইছড়ির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির হাতে। সাজেক ও বঙ্গলতলীর প্রায় পুরোটাই ইউপিডিএফ এবং জনসংহতির কবজায়, সামান্য কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ আছে জনসংহতিরও (এমএন লারমা)। বাঘাইছড়ি পৌরসভা, মারিশ্যা ও খেদারমারার পুরো নিয়ন্ত্রণ জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) ও তাদের বন্ধুপ্রতিম ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) হাতে। আর বাঙালি অধ্যুষিত আমতলী ইউনিয়নে আঞ্চলিক দলগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও আছে কমবেশি যাতায়াত। তবে এসব নিয়ন্ত্রণও খুব একটা চিরস্থায়ী নয়। নানা পরিপ্রেক্ষিত আর সুযোগের সদ্ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ কখেনো হয় আঁটসাঁট, আবার কখনো হয় ঢিলেঢালা।

মৃত্যুর মিছিল : ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর গত ২৪ বছরে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সংঘাতে ঠিক কতজন মারা গেছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। তথ্য নেই পুলিশের কাছেও। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সুনির্দিষ্টভাবেই জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তাদের ৮৩ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, এর মধ্যে ৫৮ জনকে হত্যার জন্য তারা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে এবং ২৫ জনকে হত্যার জন্য প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করেছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, ২০১০ সালের পর তাঁদের ২৮ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে শুধু এই বাঘাইছড়িতেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রাঙামাটির নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ি এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও মহালছড়িতে শক্ত ঘাঁটি দলটির। এসব উপজেলার সাবেক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যানদের প্রায় সবাই তাঁদেরই নেতা। বর্তমানেও দীঘিনালা ছাড়া বাকি তিন উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) নেতারা।

অন্যদিকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের নেতারা (ইউপিডিএফ) জানিয়েছেন, গত ২৪ বছরে তাঁদের ৩৫০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর তাঁদের ৩৫০ নেতাকর্মী আঞ্চলিক বিভিন্ন দলের হাতে খুন হয়েছেন। তবে তাঁদের মধ্যে ঠিক কতজন বাঘাইছড়িতে মারা গেছেন, সেই সম্পর্কে তাত্ক্ষণিক কিছু জানাতে পারেননি তিনি।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেশ কিছুদিন ধরেই সব যোগাযোগের বাইরে থাকা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির নেতাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। সংগঠনটির ই-মেইলে বার্তা পাঠিয়েও বক্তব্য মেলেনি। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের ভাষ্য, গত এক দশকে এই উপজেলায় সংগঠনটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

এদিকে বাঘাইছড়ি কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব হত্যা কিংবা আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র দাপট নিয়ে খুব একটা কথা বলতে চান না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্বশীলরা। পুলিশের বাঘাইছড়ি সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়াল চৌধুরী বলেন, ‘এসব আপনারা সবই জানেন, কেন—কী কারণে হয়। আমরা এসব নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে চাই না। কোনো ঘটনা ঘটলে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলে।’



সাতদিনের সেরা