kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

নতুন জীবনের গান

ভারত থেকে ফিরলেন ছয়জন

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ছেলের মুখটা আড়াই বছর পর দেখলেন, তার পরও মানিক মিয়ার মুখচ্ছবি বিষণ্ন! হারানো ছেলে শাহজাহান মিয়া ফেরত এসেছেন বটে, তবে ছেলের ডান হাতটা ছুঁতে পারছেন না বাবা। মানিক মিয়া ‘খোকা’ বলে ডাকলে, এখন আর শাহজাহানের বাঁ কানে সেই সুমধুর ডাক পৌঁছায় না। ছেলে ফেরার সুখের সময়েও এমনই কষ্ট বাসা বেঁধেছে মানিক মিয়ার মনপিঞ্জিরায়। ছেলে ফিরেছেন ঠিকই, তবে হারিয়ে এসেছেন ডান হাত আর বাঁ কান।

বিজ্ঞাপন

শাহজাহান জানিয়েছেন, মরে গেছে ভেবে তাঁকে হাত, কান কেটে রক্তাক্ত করে ভারত সীমান্তে ফেলে রেখে যায় অজানা কেউ।

প্রায় ৯ বছর পর স্বজনদের দেখা পেয়েছেন রীনা আক্তার। তাঁকে দেখেই মা-মেয়ের সে কি কান্না। রীনা আক্তার জানিয়েছেন, কিভাবে তিনি ভারত গেছেন, সেটা তাঁর মনে নেই। কেউ নিয়ে গিয়েছিল কি না সেটাও তিনি মনে করতে পারছেন না।

রীনা আক্তার ও শাহজাহানের মতো ছয় বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন গতকাল বৃহস্পতিবার। দুপুরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা থেকে বাংলাদেশের আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে ঢোকেন।

তাঁদের অনেকে পাচার হয়েছেন বলেই সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে ফেরত আসাদের মধ্যে পাঁচজন এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছেন না। উত্তর নেই সংশ্লিষ্ট কারো কাছেই।

ফেরত আসা ব্যক্তিরা হলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার চরকালি বাজাইল গ্রামের আলপনা খাতুন, বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার গোবিন্দপুর গ্রামের জিয়ারুল ইসলাম, জামালপুর সদরের নারিকেলি গ্রামের মানিক মিয়া, ঢাকার কেরানীগঞ্জের রীনা আক্তার, কিশোরগঞ্জ সদরের ভাস্কর টিলা গ্রামের হানিফা আক্তার এবং মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মানিক মিয়ার ছেলে মো. শাহজাহান। ত্রিপুরায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের সহযোগিতায় ওই ছয়জনকে বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।

দুপুরে আখাউড়া স্থলবন্দরের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে তাঁদের ভারত থেকে দেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সহকারী কমিশনার কার্যালয়ের ত্রিপুরার হাইকমিশনার মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন, প্রথম সচিব মো. রেজাউল হক, এস এম আসাদুজ্জামান প্রমুখ।

নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, ফেরত আসা ছয় বাংলাদেশিই মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ত্রিপুরায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হন। পরে আদালতের নির্দেশে আগরতলার মডার্ন সাইক্রিয়াটিক হাসপাতালে তাঁরা চিকিৎসাধীন ছিলেন। এঁদের অনেকেই এই হাসপাতালে চার থেকে পাঁচ বছর বা আরো বেশি সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ার পর তাঁদের দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই হাসপাতালে পাচারের শিকার আরো অনেক বাংলাদেশি আছেন।  

‘প্রায় ৯ বছর ধরে মাকে দেখি না। সবাই মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়। আমি সেটা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। মা আসবে জেনে দুই বছর ধরে অপেক্ষায় আছি। আজ সেই অপেক্ষা ফুরাতে যাচ্ছে। ’ কথাগুলো বলছিল এসএসসি পরীক্ষার্থী শিফা মণি। গতকাল সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দরে কথা হলে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে সে। দুপুরে ভারত থেকে আসা মা রীনা আক্তারকে কাছে পেয়ে আবেগে কাঁদেন শিফা মণি।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ডরিজাতপুর গ্রামের মানিক মিয়ার ছেলে মো. শাহজাহান ওয়াজ মাহফিলে যাবেন বলে প্রায় আড়াই বছর আগে এক রাতে বাড়ি থেকে বের হন। সেই থেকে তার খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার।

অস্পষ্ট ভাষায় শাহজাহান বলেন, ‘আমাকে মেরে বর্ডারের কাছে ফেলা রাখা হয়। ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আমি সবার কাছে আসতে পারলাম বলে ভালো লাগছে। ’

শাহজাহানের আত্মীয় লুত্ফুর রহমান ও বেলাল খান অভিযোগ করেন, ফখরুল নামের এক মামার সঙ্গে বিরোধের জেরে তাঁকে কুপিয়ে জখম করে চাতলা নামে এক সীমান্তে ফেলে রাখা হয়।

বাবা মানিক মিয়া বলেন, ‘আল্লাহ জানে কিভাবে কী হইছে। ছেলের কাছ থেকে আস্তে আস্তে সব জেনে নিব। তবে আমার মনে হচ্ছে পারিবারিক শত্রুতার কারণেই এ হামলা করা হয়েছে। ’

ফেরার পথে শাহজাহান ও তাঁর পরিবারের লোকজনকে বোঝাচ্ছিলেন আখাউড়ার ইউএনও রুমানা আক্তার। এ সময় বাবাকে উদ্দেশ করে বলতে শোনা যায়, ‘আর যাই হোক, ছেলেকে তো পেয়েছেন। আগের মতো করেই তার খেয়াল রাখবেন। ’

ফিরে আসাদের একজন জিয়ারুলের আত্মীয় মোহাম্মদ রাজ্জাক জানান, ২০১৪ সালে তাঁর স্ত্রীর বোনের স্বামী জিয়ারুল নিখোঁজ হন। তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এমন একজন মানুষ কিভাবে ভারতে পাচার হলেন সেটা নিয়ে তাঁরাও বিস্মিত।

আলপনার চাচাতো ভাই দুলাল বলেন, ‘১০ বছর আগে হঠাৎ একদিন আমার বোন নিখোঁজ হয়। অনেক পরে পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি আগরতলায় মানসিক হাসপাতালে আছে। কিন্তু কীভাবে গেল বুঝতে পারছি না। ’

ত্রিপুরার সহকারী হাইকমিশনার মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন বলেন, ‘মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে তারা পাচার হয়েছিল কি না, সেটা তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউই অভিযোগ করেনি। ’



সাতদিনের সেরা