kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

জীবনসংগ্রাম

ট্রেনে ট্রেনে রুস্তির হাঁক

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ট্রেনে ট্রেনে রুস্তির হাঁক

রুস্তি কস্তা। কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনে। গত ১৯ অক্টোবর। ছবি : কালের কণ্ঠ

চলতি ট্রেনে ফেরিওয়ালার হাঁক তো সবাই শুনেছেন। কিন্তু, সেই ডাক যদি হয় কোনো নারীকণ্ঠের? তো সেই ডাক শুনে কান তো খাড়া হবেই, সঙ্গে চোখও।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনে এমন দৃশ্য দেখা গেছে গত ১৯ অক্টোবর।

ট্রেনটির পেছনের দিকের ‘ছ’ বগিতে বসা ছিলেন এই প্রতিবেদক। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৪টা। হঠাৎ কানে আসে ‘এই বাদাম আছে, মটর ভাজা আছে, বরই আচার, ঝালমুড়ি আছে, পান, সিগারেট।’ এমন ডাক শুনে সবার চোখ একদিকে। পাঁচ টাকায় ঝালমুড়ি কিনে কথা জুড়ে দিলেন এক যাত্রী। সেই কথায় যোগ দেন এই প্রতিবেদকও।

ফেরিওয়ালা রুস্তি কস্তা জানান, অন্য ১০টা পুরুষের মতো তিনিও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা (হকার)। এ ট্রেন ও ট্রেন চড়ে বেড়ান। সংসারের দায়িত্বভার তাঁর কাঁধেই। বয়স চল্লিশের ঘরে। তাঁর আয়ে চলে পাঁচজনের সংসার। সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বের হন এবং রাত ১১টায় ফেরেন। গত ১৫ বছর ধরে এভাবে চলছে।

তিনি জানালেন, স্বামী পংকজ কস্তা অনেকটা সহজসরল মানুষ। সেভাবে কোনো কাজ করা হয়ে ওঠে না। মাঝেমধ্যে ফসলের মাঠে শ্রমিকের কাজ করেন। বড় ছেলে অরেন কস্তা পড়েন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, ছোট ছেলে অন্তর কস্তা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। তাঁদের বাড়ি গাজীপুরের আড়িখোলা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে।

দৈনন্দিনের কাজের আদ্যোপান্ত জানালেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেন দিয়ে সকাল সাড়ে ৯টা-১০টার দিকে শুরু করেন। আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে এসে নামেন দুপুর ১টা-দেড়টার দিকে। আখাউড়ায় কোনো হোটেলে দুপুরে খেয়ে আবার ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে ওঠেন। ট্রেনটি সন্ধ্যা ৭টা-সাড়ে ৭টার দিকে যে স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়, সেখানে নেমে আবার ওঠেন ফিরতি নোয়াখালী এক্সপ্রেস ট্রেনে। ওই ট্রেনে এসে আড়িখোলা নামতে নামতে রাত ৯টা-সাড়ে ৯টা বেজে যায়। যেসব স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম নেই, সেখানে তিনি নামেন না। এ ছাড়া ভিড় এড়িয়ে চলেন।

রুস্তি বলেন, ‘সকালে আমি রান্না করেই বাড়ি থেকে বের হই। শাশুড়ি দুই সন্তানকে দেখেন। ব্যস্ততার কারণে ছেলেদের সময় দিতে পারি না বলে কষ্ট লাগে।’

তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টাকার মতো লাভ হয়। তবে করোনায় ট্রেন বন্ধ থাকায় কিস্তিতে টাকা তুলে সংসার চালিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন, ‘পড়ালেখা করিয়ে সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করতে পারা। সুন্দর একটা সংসার গড়তে পারা।’

ওই নারীর সঙ্গে কথা বলতে থাকা যাত্রী মো. আমীর হোসেন বলেন, ‘প্রথমবারের মতো এক নারীকে ট্রেনে হকারের পেশায় দেখলাম। বিষয়টি আমাকে অবাক করায় ওনার কাছ থেকে ঝালমুড়ি কিনে খাই। আলাপচারিতায় ওনার পারিবারিক বিষয় সম্পর্কে জেনে অবাক হই।’

আরেক যাত্রী মো. আরিফ বলেন, ‘একজন নারী হয়েও যেভাবে সাবলীল ভঙ্গিতে ওই নারী ট্রেনে পণ্য বিক্রি করছেন, সেটা অবাক করার মতোই। সুযোগ পেলে একজন নারী যে সব পারে, এর উদাহরণ হতে পারেন তিনি।’

রুস্তি ভীষণ ব্যস্ত। দ্রুত তাঁকে পসরা নিয়ে ছুুটতে হবে। শেষ প্রশ্ন, দিদি, চলার পথে কোনো সমস্যা হয় কি? এই প্রশ্নের উত্তরে হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘চলার পথে কোনো সমস্যা হয় না। সব মিলিয়ে বেশ ভালো আছি।’



সাতদিনের সেরা