kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

মিতুকে হত্যার পর জিডি করেন স্বামী!

‘আপনার মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছি।’

মাসুদ রানা   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একসময়ের চাকুরে কামরুল বছর চারেক আগে শুরু করেন রাসায়নিকের (কেমিক্যাল) ব্যবসা। সেখানকার রোজগার দিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু কামরুলের মনোযোগ টাকা কামানোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন একাধিক নারীর সঙ্গে। এ নিয়ে সংসারে শুরু হয় অশান্তি। তখন তিনি ‘পথের কাঁটা’ স্ত্রী মাহমুদা আঞ্জুমান আরা মিতুকে দূর করার সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদের সহযোগিতায় মিতুকে অপহরণের পর হত্যা করেন। এরপর স্ত্রীর খোঁজে নিজেই ঢাকার ডেমরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তবে এমন ছলচাতুরীতে কামরুলের শেষ রক্ষা হয়নি। শেষমেশ স্ত্রী হত্যার প্রধান আসামি হয়েছেন তিনি; স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আদালতে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডেমরা থানায় কামরুল হাওলাদার ও তাঁর আপন ভাই ফোরকানসহ চারজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অচেনা দু-তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন মিতুর বাবা নুরুল আমিন। অভিযুক্ত অন্য আসামিরা হলেন তাঁদের বাড়ির ভাড়াটিয়া শহিদুল ও অজানা ঠিকানার ইব্রাহিম। এ মামলায় মৃতের স্বামী কামরুল ও তাঁর আপন ভাই ফোরকান দোষ স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার আবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, কামরুল মিতুকে হত্যার পর তাঁর পিতাকে বলেন, ‘আপনার মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছি।’ এরপর ভুক্তভোগীর স্বামী ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ডেমরা থানায় জিডি করেন। ওই দিন রাতেই মিতুর মৃতদেহ নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে বলে শ্বশুরকে জানান কামরুল। এ হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে কামরুল ও তাঁর ভাই ফোরকানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হন। পরবর্তী সময়ে তাঁরা আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন।

মামলার এজাহারে বাদী জানান, ১২ বছর আগে তাঁর মেয়ে আঞ্জুমান আরা মিতুর সঙ্গে কামরুল হাওলাদারের বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে মৌলি নামের ৯ বছর বয়সের কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের পর চার-পাঁচ ছর মেয়ে তাঁর বাড়িতেই (পিরোজপুরের কাউখালী) বসবাস করতেন। তখন কামরুল হাওলাদার ঢাকায় চাকরি করতেন। এরপর গত তিন-চার বছর ধরে কামরুল ঢাকায় রাসায়নিকের ব্যবসা করেন। তবে তিনি লেখাপড়া বেশি না জানায় তাঁর মেয়ে মিতু ব্যবসায়ের সব আর্থিক লেনদেনের হিসাব রাখতেন। তিন-চার বছর ধরে তাঁর জামাই কামরুল বিভিন্ন নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এতে তাঁর মেয়ের সংসারে অশান্তি শুরু হয়। এসব কাজে তাঁর মেয়ে মিতু বাধা দিলে কামরুল তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন করেন, আর মিতুকে হত্যার পরিকল্পনা করে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার বাসস্ট্যান্ড থেকে মিতুকে অপহরণ করে নিয়ে যান কামরুল ও তাঁর ভাই ফোরকান এবং শহিদুল, ইব্রাহিমসহ কয়েকজন। এরপর মিতুকে হত্যা করে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানার তাজমহল রোড এলাকার পাশের জমিতে ফেলে রাখা হয়।

মিতুর বাবা মো. নুরুল আমিন হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়েকে হত্যার পর নিখোঁজের নাটক সাজিয়ে কামরুল থানায় জিডি করে। আবার সে-ই আমাকে মেয়ের মৃত্যুর খবর জানায়। আমার মেয়ের মৃত্যুর পর তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা, কষ্ট, ক্ষোভ দেখা যায়নি।’

নুরুল আমিন আরো বলেন, ‘আমার মৃত মেয়ে মিতুর ৯ বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সে এখন একা হয়ে গেল। তাকে নিয়ে আমার মেয়ে অনেক স্বপ্ন দেখত। আমার ছোট নাতনিকে নিয়ে এখন আমাদের বড় চিন্তা। এই বয়সে মাকে ছাড়া কোনো সন্তান তো ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে না।’

ডেমরা থানার ওসি খন্দকার নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, মিতু হত্যার বিষয়টি স্বীকার করে আসামি কামরুল ও ফোরকান আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ মামলার অন্য আসামি শহিদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি এখন তিন দিনের রিমান্ডে আছেন। এ ছাড়া এ মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।



সাতদিনের সেরা