kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত হলেও নেই প্রতিকার

ঢাকায় ১০০০ ভবন অতিঝুঁকিতে, সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ৫০০০

এস এম আজাদ   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজধানীর গুলশান ১ নম্বর সেকশন মোড়েই সবার নজর কাড়ে ছয়তলা একটি বড় পুরনো বাণিজ্যিক ভবন। নাম গুলশান শপিং সেন্টার। ব্যস্ত সড়কের পাশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিপূর্ণ ভবনটি ঘিরে সব সময় থাকে অনেক মানুষের ব্যস্ততা। রাস্তা থেকে এই ভবনের দেয়ালে সাঁটানো একটি ছোট পোস্টার নজর কাড়ছে। লাল রঙের ব্যানারে সাদা হরফে লেখা, ‘অগ্নিনিরাপত্তাহীন ও ব্যবহার অনুপযোগী। আদেশক্রমে : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর’।

জানতে চাইলে ভবনটির নিচতলার দোকানদার রাসেল বলেন, ‘আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এটি লাগিয়ে দিয়ে গেছে। আমরা আর কিছু জানি না।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে পাশের ডিসিসি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল গুলশান শপিং সেন্টারেরই একটি অংশে আগুন লাগে। এসব ঘটনার সূত্র ধরে ২০১৯ সালেই গুলশান শপিং সেন্টার ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস নোটিশ লাগায়। এর পরও কোনো পক্ষ থেকে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে ভবনটির মালিকপক্ষের প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস হোজপাইপ, ৫০ হাজার লিটার পানির রিজার্ভার ও ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখার রিকুইজিশন দেয়। রিজার্ভার ও এক্সটিংগুইশারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভবনটি ভেঙে নতুন বহুতল ভবন করার কথা রয়েছে। তবে সম্প্রতি আমাদের কম্পানির এমডি সাহেব মারা যাওয়ায় অগ্রগতি হয়নি।’

এ রকম ঝুঁকির ব্যানার ও নোটিশ নিয়ে চলছে পাঁচ হজার বহুতল ভবন। দুই বছর আগেই ঢাকায় অতিঝুঁকিপূর্ণ বলে শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ৬৬টি ভবন। ভবনগুলোতে নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যানার সাঁটানো শুরু করেছিল ফায়ার সার্ভিস। একযোগে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে ৩৯টি ভবনে নোটিশ সাঁটানোর পরই থমকে যায় সেই কার্যক্রম। ভবনগুলোতে কয়েক দফায় নোটিশ দেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেনি। করোনাকালে আটকে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত এবং নিরাপত্তা জোরদারের বাধ্য করার সেই কার্যক্রম। ২০১৯-২০ সালের ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সব ধরনের ৯০ শতাংশ ভবনেই অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। ঢাকার ৯৮ শতাংশ মার্কেটেই সন্তোষজনক অবস্থা নেই। ঢাকায়ই ৬২২টি মার্কেট শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো অতিঝুঁকিপূর্ণ।  

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের ছয়তলা কারখানা এবং বনানীর বাণিজ্যিক ভবন এমিকন সেন্টারসহ কয়েকটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর দেখা গেছে, ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। এতে অগ্নিঝুঁকির বিষয়টি ফের এসেছে আলোচনায়। দুর্ঘটনার পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে মার্কেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা না থাকলে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন  বলেন, ‘ভবনের ঝুঁকি চিহ্নিত করে আমরা সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিই। ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের তাগিদও দেই। তবে এই দায়িত্ব তাদের। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও করোনার কারণে তা বন্ধ আছে।’

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোর পাঁচ হাজার ২০৭টি ভবন পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের দল। অগ্নিকাণ্ডের নিরাপত্তার সন্তোষজনক পরিস্থিতি পাওয়া গেছে ৫০২টি ভবনে। এই হিসাবে ৯০ শতাংশ বহুতল ভবনই রয়েছে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে। মাত্র ১০ শতাংশের অবস্থা সন্তোষজনক। ৯০ শতাংশের মধ্যে আবার ২৩ শতাংশ অতিঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিদর্শনে ঢাকার এক হাজার ৬৬টি এবং চট্টগ্রামে ৫০টি অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবন পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, এক হাজার ৫৯৫টি বিপণিবিতান বা বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে হাতে গোনা কয়েকটির অবস্থা সন্তোষজনক, মাত্র ২ শতাংশ। ৪২ শতাংশে অতিঝুঁকি এবং ৫৬ শতাংশে ঝুঁকি পেয়েছেন পরিদর্শনকারীরা। ঢাকার বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকার ৬২২টি বাণিজ্যিক ভবন অতিঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রমাণ পেয়েছেন তাঁরা। ঢাকার এক হাজার ৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে মাত্র ১৩টির অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা সন্তোষজনক পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯২ শতাংশ ভবনই আছে ঝুঁকিতে। অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ২৯৫টি। একইভাবে ৪২৩টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিদর্শন করে ১০৫টি অতিঝুঁকিপূর্ণ পাওয়া যায়। ঢাকার ৩৩৬টি আবাসিক হোটেলের মধ্যে ২১টিই অতিঝুঁকিপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২৪টি বিষয়ের ওপর পর্যবেক্ষণ করে শনাক্ত করা হয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে থাকা ভবন। জরিপের ফলাফল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাকে জানানো হয়েছে। পরিদর্শনে পাওয়া ঘাটতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক বা প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা ব্যবস্থা নেয় না। বারবার চিঠি দেওয়া হলেও তা আমলে নিচ্ছেন না ভবন মালিকরা।



সাতদিনের সেরা