kalerkantho

সোমবার ।  ২৩ মে ২০২২ । ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২১ শাওয়াল ১৪৪৩  

ঘুষের রেটে ফাইল ‘হাঁটে’

ফরিদপুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়

নির্মলেন্দু চক্রবর্তী শঙ্কর, ফরিদপুর   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘুষের রেটে ফাইল ‘হাঁটে’

ফরিদপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মাহবুবুল ইসলাম। তাঁর টেবিল হয়েই ফাইল যায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। পিআরএল, পেনশন ও আনুতোষিক, জিপিএফ মঞ্জুরি, উচ্চতর স্কেল মঞ্জুরিসহ যেকোনো ফাইল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে (ফরোয়ার্ডিং) এই টেবিলে দিতে হয় ঘুষ। একেক ফাইলের একেক রেট।

বিজ্ঞাপন

রয়েছে ঘুষের তালিকাও। নির্দিষ্ট হারে ঘুষ না দিলে দীর্ঘদিনেও কাজ হয় না। ওই কার্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক কর্মচারীরাই এই তথ্য জানিয়ে উপপরিচালকের লাগামহীন দুর্নীতির তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ওই কর্মচারীদের অভিযোগ, উপপরিচালক মাহবুবুল ইসলামের সইয়ে কোনো ফাইল ফরোয়ার্ডিংয়ের জন্য ঘুষের রেট—পিআরএল (তৃতীয় শ্রেণি) তিন হাজার টাকা, পেনশন ও আনুতোষিক (তৃতীয় শ্রেণি) পাঁচ হাজার টাকা; পিআরএল, পেনশন ও আনুতোষিক (চতুর্থ শ্রেণি) তিন হাজার টাকা, উচ্চতর স্কেলের মঞ্জুরি (তৃতীয় শ্রেণি) এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যেকোনো ফরোয়ার্ডিং পাঠানোর জন্য দেড় হাজার টাকা করে। ঘুষের টাকা দিতে বিলম্ব হলে তাঁদের আবেদনও তিনি মঞ্জুর করেন পরে।

রওশন জামিল নামের সাবেক পরিবার কল্যাণ সহকারী অভিযোগ করেছেন, তিনি পিআরএলে থাকাবস্থায় সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের অর্থ উত্তোলনের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু ওই আবেদন ফরোয়ার্ডিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট এক হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ দিতে পারেননি। এ কারণে জেলা কার্যালয় থেকে সাড়ে পাঁচ মাস পর গত ৯ সেপ্টেম্বর আবেদনটি বিভাগীয় কার্যালয়ে পৌঁছে। অথচ উপপরিচালক মাহবুবুল ইসলামের সইয়ের তারিখ রয়েছে ২৫ মার্চ। এ ছাড়া ঘুষের টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তাঁর পেনশন ও আনুতোষিক মঞ্জুরের আবেদনটি পাঁচ মাস পর সই করে ফরোয়ার্ডিং করা হয়েছে।

মোর্শেদা খানম নামের আরেকজন সাবেক পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার অভিযোগ, পিআরএল মঞ্জুরির জন্য তাঁকে ১২ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

বিধান মণ্ডল নামের একজন অফিস সহায়ক কাম নিরাপত্তা প্রহরী অভিযোগ করেন, অফিস সহায়ক পদে পদায়নের আবেদন ফরোয়ার্ডিংয়ের জন্য তাঁর কাছ থেকে উপপরিচালকের নির্দেশের কথা বলে এক হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে।

মধুখালী উপজেলা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক আজাদ ফকির জিপিএফ অগ্রিম মঞ্জুরির জন্য আবেদন করলে জেলা কার্যালয় হতে তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে বলা হয় তাঁকে। না দিলে কারণ দর্শানোর নোটিশ করার হুমকি দেওয়ার পর তিনি এক হাজার টাকা ঘুষ দেন।

ফরিদপুরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের একজন নার্সকে বদলির জন্য ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বদলির জন্য সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্তও ঘুষ দিতে হয়।

ইউনিয়ন পর্যায়ের এফপিআই এবং পরিবার কল্যাণ সহকারীরা জানান, তাঁদের উচ্চতর স্কেল মঞ্জুরির জন্য প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে।

একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানের প্রতিবন্ধী সনদ সিভিল সার্জনের কাছে ফরোয়ার্ডিংয়ের জন্যও ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পিআরএলে থাকা পরিবার কল্যাণ সহকারী সবিতা রানী সরকার, মীরা রানী ঘোষ, গীতা রানী গুহ, সুষমা রানী বল, খালেদা আক্তার, রেহেনা সুলতানা, নাসিমা আক্তার, চঞ্চলা রানী পোদ্দার, আয়া বাসনা খাতুন, মজিরুন নেছা, সালেহা বেগম, নিরাপত্তা প্রহরী মো. খবির উদ্দিন, মো. আব্দুল গফুরসহ সাবেক কর্মচারীরা এ ধরনের অভিযোগ করছেন। তাঁদের প্রত্যেককেই ফরোয়ার্ডিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট হারে ঘুষ দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

এ ছাড়া কর্মচারীদের সাজপোশাকের বরাদ্দ কম দেওয়া, আসবাব খাতে বরাদ্দের ৬০ হাজার টাকা পুরোটা আত্মসাৎ করা ছাড়াও ভুয়া ভাউচার করে অফিসের টয়লেট পেপার, হারপিক, ফিনাইল, তোয়ালে, অফিস স্টেশনারির মতো বিভিন্ন সামগ্রী কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ করেন কর্মচারীরা।

গাড়িচালক জব্বার মোল্লা বলেন, উপপরিচালকের সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করে গাড়ির কাজের ভুয়া বিল করে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সময়মতো সার্ভিসিং না করায় গাড়িটি অচল হওয়ার পথে।

বিভিন্ন এনজিওর অনুকূলে সরকারের অনুদান ছাড় করাতে উপপরিচালককে ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

একটি এনজিওর নির্বাহী পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, ৭৫ হাজার টাকা অনুদানের বিল-ভাউচার অনুমোদনের জন্য তাঁকে সাত হাজার টাকা দিতে হয়েছে উপপরিচালককে। এ ছাড়া অনুদানপ্রাপ্তির আবেদনের সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্যও এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক মো. মাহবুবুল ইসলাম ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কারো কাছ থেকে ঘুষ নিই না, কিন্তু আমার কথা বলে আমার অফিসের কেউ হয়তো ঘুষ নিয়ে থাকতে পারে। তবে তাঁরা কেউই আমার কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। ’ এ ছাড়া তিনি কেনাকাটাসহ সব ধরনের অভিযোগও অস্বীকার করেন।



সাতদিনের সেরা