kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

তুচ্ছ ঘটনায় খুনাখুনি হচ্ছে রাজধানীতে

মোবারক আজাদ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তুচ্ছ ঘটনায় খুনাখুনি হচ্ছে রাজধানীতে

মহল্লার খেলার মাঠে হাফিজের (১৩) সঙ্গে তর্ক হয় চার কিশোরের। এর জেরে পরদিন হাফিজকে কৌশলে তার বাসার পাশের একটি বাড়ির ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। একসঙ্গে চলাফেরা করত বলে হাফিজের কিছু সন্দেহ হয় না, কিন্তু পরে হাফিজের দুই হাত বেঁধে ধারালো চাকু দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করে ওই চার কিশোর। আর লাশ ফেলে যায় পাশের আরেক বাড়ির ছাদের বাথরুমে। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর লালবাগ থানার ডুরি আঙ্গুল লেনে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরদিন দুটি চাকুসহ হত্যায় জড়িত চার কিশোরকে আটক করে পুলিশ। এর আগে গত ২৮ আগস্ট রাতে হাতিরঝিল থানার পশ্চিম রামপুরা উলন রোডের ৫৭ নম্বর বাড়িতে গেট খোলা নিয়ে তর্কের এক পর্যায়ে বাড়িওয়ালার ছোট ভাই কাজী জিকুর (৩৭) ইট ছুড়ে মারেন ভাড়াটিয়া কামরুল ইসলামকে (৬৫)। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। আর এর আগে গত ২৬ আগস্ট মুগদায় পাওনা টাকা চাওয়ায় নাসির মিয়া (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়।

এভাবে অতি তুচ্ছ ঘটনায় গত ৯ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৫ দিনে রাজধানীতে ১২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের শিশু থেকে ৬৫ বছরে বৃদ্ধ। অতি তুচ্ছ ঘটনায় পাশাপাশি এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে পূর্বশত্রুতা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা এসব ঘটনায় জড়িত বেশির ভাগ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। গ্রেপ্তারের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেসব ঘটনায় রহস্যজট আছে, সেগুলো নিয়েও অনুসন্ধান চলছে। এসব ঘটনা রোধে প্রথমে পরিবারকে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বায়নের ফলে যে পরিবর্তন, মানুষ তার সঙ্গে মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে সমান্তরালে ধারণ করতে পারছে না। ফলে সামান্যতেই মানুষ উত্তেজিত হয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এর জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় রয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ শিক্ষাসহ খেলাধুলা, বিনোদনের ব্যবস্থা করা জরুরি। আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের আরো তৎপর হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য মতে, চলতি বছর গত সাত মাসে  (জানুয়ারি-জুলাই) রাজধানীতে ৯২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগের পেছনে রয়েছে তুচ্ছ ঘটনা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিংবা পারিবারিক সহিংসতায় যেসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তাতে পুলিশের খুব বেশি কিছু করার নেই। ঘটনা ঘটলে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক নৈতিকতা তো পুলিশ গড়ে দিতে পারে না। শিশু-কিশোরদের পারিবারিক ও সামাজিক নৈতিক শিক্ষায় পরিবারের সদস্যদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ড : ৭ সেপ্টেম্বর বেশি টাকা দাবি করায় এক যৌনকর্মীকে শ্যামলীর এক আবাসিক হোটেলে হত্যা করে মো. খোকন ভুঁইয়া (২৮) নামের এক রেস্তোরাঁ কর্মী। ৬ সেপ্টেম্বর কামরাঙ্গীর চর আচারওয়ালাঘাট এলাকায় ছুরি মেরে হত্যা করা হয় সানোয়ার হোসেন (১৮) নামের এক তরুণকে। ৩ সেপ্টেম্বর লালবাগে হাফিজ (১৩) নামের এক কিশোরকে জবাই করে হত্যা করা হয়। ৩১ আগস্ট সেগুনবাগিচায় একটি প্রাইভেট কার থেকে দুই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৭ আগস্ট পশ্চিম রামপুরায় ইট ছুড়ে হত্যা করা হয় কামরুল ইসলাম (৬৫) নামের এক ব্যক্তিকে। ২৬ আগস্ট মুগদায় পাওনা টাকা চাওয়ায় নাসির মিয়া (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। ১০ আগস্ট কদমতলীতে সাগর শিকদার নামের এক রিকশাচালকে ছুরি মেরে হত্যা করে দৃর্বৃত্তরা। ৯ সেপ্টেম্বর সবুজবাগ বাসাবো এলাকায় চোর সন্দেহে হৃদয় (২৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর মতিঝিলে হৃদয় (২০) নামের এক তরুণকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পারিবারিক মূল্যবোধ ও বন্ধন বহুলাংশে ভেঙে পড়েছে। ফলে কিছু মানুষ যেকোনো ধরনের অপরাধ করতে একটুও ভাবে না। একটা মানুষ যখন পরিবারিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে যায় তখন সে যেকোনো ধরনের অপরাধ করার আগে পরিণতির বিষয়টা ভাবে। এ কারণে পারিবারিক বন্ধনটা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে হবে। তাহলে সমাজে অপরাধের মাত্রা কমে আসবে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শিপ্রা সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, উচ্চাভিলাষী প্রত্যাশা পূরণ না

হওয়ার মতো বিভিন্ন কারণে হতাশা থেকে মানুষ অপরাধে জড়াচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে পরিবার ও সমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে।’



সাতদিনের সেরা