kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

পানিবন্দি লাখো মানুষ

♦ স্কুলের শ্রেণিকক্ষেও পানি
♦ পটুয়াখালী শহরে জোয়ারের পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পানিবন্দি লাখো মানুষ

রাজবাড়ীতে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে ভোগান্তি থেকে এখনো মুক্তি মেলেনি মানুষের। গতকাল কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের হরিণবাড়িয়ার চরে। ছবি : কালের কণ্ঠ

তিস্তা ছাড়া বেশির ভাগ নদ-নদীর পানিই কমেছে। এর পরও ১০টি নদীর পানি ১৬ পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। ফলে পানিবন্দি মানুষকে প্রচণ্ড দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। উপদ্রুত এলাকার বিভিন্ন স্কুলের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে গেছে। নদীপারের মানুষ ভাঙন আতঙ্কে দিন পার করছে। ফসলের মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ হতাশায় দিন পার করছে।

আজ থেকে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

এদিকে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়েছে পটুয়াখালী শহরেও। এতে শহরবাসীর জীবনযাত্রায় চরম দুর্ভোগ নেমে আসে। পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটক, শহরের মহিলা কলেজ রোড, পোস্ট অফিস সড়ক, নবাবপাড়া, নিউ মার্কেট, এসডিও রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকা জোয়ারের পানিতে ডুবে রয়েছে। দুই দিন ধরে চলছে এ অবস্থা।

পটুয়াখালী পোস্ট অফিস সড়কের ব্যবসায়ী মো. আরাফাত হোসেন বলেন, ‘অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারে প্রায় তিন দিন এভাবে পানি উঠে শহরের সব বাণিজ্যিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট ডুবে যায়। ফলে সব ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন। বর্ষা মৌসুমের শুরুর দিকে এমন জোয়ারে বিড়ম্বনা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। নিউ মার্কেট এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আশপাশের রাস্তাগুলো উঁচু হলেও মার্কেটটি নিচু। তাই জোয়ারের পানিতে মার্কেটের অভ্যন্তরের ড্রেন দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে সহজে। প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা থাকে পানির জন্য অচলাবস্থা।’

পটুয়াখালী পৌরসভার মেয়র মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পটুয়াখালী শহর রক্ষা বাঁধ নির্মিত হলেও জোয়ারের পানিতে শহর প্লাবিত হয়। সমস্যা সমাধানে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পটুয়াখালী পৌরসভা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এ ছাড়া শহরে নদীর পার দিয়ে একটি মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

শরীয়তপুরে পদ্মার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়রা জানায়, তিন দিন ধরে বৃদ্ধি পাচ্ছে পদ্মা নদীর পানি। গতকাল সকাল ৬টায় সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপত্সীমার ৭৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জেলার নড়িয়া, জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৫২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে।

জেলার নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে নতুন করে পানি ঢুকে পড়েছে। নড়িয়া-জাজিরা সড়কের মোক্তারের চর এলাকা তলিয়ে গেছে। প্রবল স্রোতে জাজিরা উপজেলায় পদ্মার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ডাম্পিং অব্যাহত রেখেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভাঙনকবলিত কুণ্ডের চর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা ও নগদ অর্থ বিতরণ করেছে জেলা প্রশাসন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্তরা।

শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার চারটি, জাজিরা উপজেলায় ১৯টি ও নড়িয়া উপজেলায় ২২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়াও নড়িয়ার আটটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়েছে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা নদীর পানি কমেছে। তবে এখনো বিপত্সীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় গোয়ালন্দ পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার পানি কমে বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ নিয়ে গত দুই দিনে গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মায় পানি কমেছে ১৫ সেন্টিমিটার। এদিকে পদ্মার পানি বিপত্সীমার ওপরে থাকায় গোয়ালন্দ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো প্লাবিত হয়ে আছে। সেখানে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপত্সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে ফুলছড়ি উপজেলার এড়েণ্ডাবাড়ী, ফজলুপুর, সদর উপজেলার কামারজানি, মোল্লারচরের অনেক বাড়িঘরে এখনো পানি রয়েছে। ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এবারের বন্যায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার সর্বোচ্চ ৫২ সেন্টিমিটার পর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ফুলছড়ি উপজেলার ফুলছড়ি ইউনিয়নের গাবগাছি গ্রামের কৃষক শাহ আলম (২৮) জানান, তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করেছিলেন, পানিতে ডুবে সব নষ্ট হয়ে গেছে। একই গ্রামের আব্দুর রহমান (৪৬) জানান, তাঁর সাত বিঘা জমির রোপা আমন ধান ও বেশ কিছু শাক-সবজির ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধারদেনায় আবাদ করে এখন বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, গাবগাছি গ্রামের প্রায় সব কৃষক কমবেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

গতকাল রাজবাড়ীর তিনটি গেজ স্টেশন পয়েন্টেই কমেছে পদ্মার পানি। গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ায় পানি ১০ সেন্টিমিটার কমে ৬২ ও রাজবাড়ী সদরের মহেন্দ্রপুরে ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ১৯ এবং পাংশার সেনগ্রামে সাত সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রাবাহিত হচ্ছে।

নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকায় চলাচল, থাকা-খাওয়া, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গোখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা দিলেও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ওড়িশা উপকূলের অদূরে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও কাছাকাছি পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকার লঘুচাপটি বর্তমানে পূর্ব মধ্য প্রদেশ ও তত্সংলগ্ন এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে অবস্থান করছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও কাছাকাছি এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা, উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ জন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে গতকালের আবহাওয়ার সতর্কবার্তায়।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।)



সাতদিনের সেরা