kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

হাতিরঝিলে উৎকট গন্ধ

বেড়াতে এসে নাকে রুমাল!

জহিরুল ইসলাম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বেড়াতে এসে নাকে রুমাল!

হাতিরঝিলে পা রাখতেই পাঁচ বছরের আফনান বলে উঠল, ‘উফ বাবা! কী গন্ধ!’ মাস্ক ভেদ করে শিশুটির নাকে ঝাপটা মারে ঝিলের পানির উৎকট গন্ধ। আফনানের মা ছেলের মাস্কটা আরেকটু টেনে দিয়ে নিজেরটাও ঠিকঠাক করে নিলেন। বাবা আব্দুল হাকিম বললেন, ‘করোনার মধ্যে পরিবার নিয়ে বের হইনি। আজ বেরিয়েছি, কিন্তু এত সুন্দর একটা স্থানের এ কী হাল! দুর্গন্ধে তো টেকাই যাচ্ছে না!’

আব্দুল হাকিমের পরিবারটি এসেছে রাজধানীর আজিমপুর বটতলা এলাকা থেকে।

বিজ্ঞাপন

গত মঙ্গলবার এই পরিবারটির মতো হাতিরঝিলে আসা অন্যদের অভিজ্ঞতাও ছিল একই। স্বস্তিতে কিছু সময় কাটানোর পরিকল্পনা নিয়ে আসা নগরবাসী ফিরে গেল সাততাড়াতাড়িই।

করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় বাইরে বেরোনোর সুযোগ হয়নি মানুষের। সংক্রমণ ও মৃত্যুহার—উভয়ই কমতে শুরু করায় পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকেই পরিবার নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে যাচ্ছে, কিন্তু নগরবাসীর অন্যতম আকর্ষণ দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিলে যারা যাচ্ছে, তারাই হতাশ হচ্ছে। দুই হাজার ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প এলাকায় বেড়ানোর অভিজ্ঞতা সুখকর হচ্ছে না তাদের।

রাজউক সূত্র জানায়, প্রকল্পটি উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিবছর বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হতে হচ্ছে রাজউককে। এ গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি শোধন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, কিন্তু প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হলেও আশানুরূপ উন্নতি হয়নি।

দেখা গেল, ঝিলের বদ্ধ পানিতে ভাসছে বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা। সেগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কারওয়ানবাজার হয়ে হাতিরঝিল ঢোকার পথে লেকের পানি কালচে বর্ণে। ওপরে আস্তরণ পড়ে গেছে। বাতাসে অল্প একটু নড়াচড়া ছাড়া ঢেউ নেই। যতটা ঢেউ তৈরি হয়, তা ওয়াটারবাসের যাওয়া-আসার সময়। সে সময় ময়লা নাড়া খেয়ে দুর্গন্ধ আরো প্রকট হচ্ছে। ঘুরতে আসা মানুষজনসহ পথচারীদের কেউ কেউ মাস্কের ওপরও নাক চেপে চলছে।

হাতিরঝিলে চা ও পান-সিগারেটের ব্যবসা করেন শহীদ উল্লাহ। তিনি বললেন, ‘আগে মানুষ ভিতরে আইয়া চা-টা খাইতো; এখন কেউ নিতে চায় না। ভিতরে যে গন্ধ নিজেই বইতাম পারি না, তাগো কথা কী কমু!’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে হাতিরঝিলের ১১টি পানি নিষ্কাশন গেট খুলে দেওয়া হয়। তখন ময়লা মিশ্রিত পানি হাতিরঝিলে ঢুকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। হাতিরঝিলের পানির দুর্গন্ধ ঠেকাতে প্রকল্প গ্রহণ করেও কোনো সুফল না আসায় শুষ্ক মৌসুমে গেটগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজউক। শুধু বর্ষা মৌসুমেই খোলা থাকবে গেটগুলো।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্ষাকালে ১১টি গেট খোলা ছিল। গেটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে ড্রেনের ময়লাগুলো হাতিরঝিলে না ঢোকে। এরই মধ্যে পানির লেভেল এবং সার্বিক দিক সরেজমিনে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে শুষ্ক মৌসুমে আর গেট খোলা রাখা হবে না। কোনো ধরনের ড্রেনের পানি ঢোকানো হবে না। নয়তো ময়লা, দুর্গন্ধ যাবে না। ’

নগর বিশেষজ্ঞ ড. আদিল মোহাম্মদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উৎকট গন্ধের মূল কারণ হচ্ছে আশপাশের পয়োবর্জ্যের সংযোগ সরাসরি হাতিরঝিলের দিকে থাকা। সেই সঙ্গে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনার লাইনও সংযুক্ত রয়েছে। অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী কোনো বসতবাড়ির সংযোগ সরাসরি জলাশয়ে দেওয়া যাবে না। ’

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নগর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি মনিটরিং জোরদার করেনি অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি উত্তর সিটি করপোরেশন সেপটিক ট্যাংক করার প্রতি জোর দিচ্ছেন। এটি বাস্তবায়ন জরুরি। একজন বাড়ির মালিকের বর্জ্যের দায়ভার পরিবেশ, নগর বা রাষ্ট্র নিতে পারে না। ’ এই ব্যাপারে শুধু সতর্ক করা নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।



সাতদিনের সেরা