kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

বন্যায় আক্রান্ত ১৩ জেলা আতঙ্ক এখন নদীভাঙন

♦ চার জেলায় উন্নতি
♦ পাঁচ জেলায় স্থিতিশীল
♦ চার জেলায় অবনতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বন্যায় আক্রান্ত ১৩ জেলা আতঙ্ক এখন নদীভাঙন

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা নদীর পানি বেড়েই চলেছে। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো পরিবার। গতকাল গোয়ালন্দের বেপারীপাড়া গ্রাম থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে এ বছর বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে ১৩ জেলা। গতকাল থেকে কিছু জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমছে না। অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি। কেউ কেউ উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। এখন নদীভাঙন নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, উন্নতি হওয়া চারটি জেলা হচ্ছে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া। স্থিতিশীল আছে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরে। তবে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

গতকাল সকাল ৯টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমছে, যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় উভয় নদীর পানিই কমতে পারে। তবে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বাড়ছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। বর্তমানে ৯টি নদীর পানি ২১ পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীগুলো হচ্ছে ধরলা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তুরাগ, কালীগঙ্গা, পদ্মা, আত্রাই ও ধলেশ্বরী।

নীলফামারীতে পানি কমেছে তিস্তায়। গতকাল শনিবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। গতকাল পানি কমলেও অন্তত দুই হাজার পরিবারের বাড়িতে বন্যার পানি বিরাজ করছে বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

অন্যদিকে তিস্তার পানি কমলেও ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ভেণ্ডাবাড়ী গ্রামে বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হাজারো পরিবারের দুর্ভোগ কমেনি। ভাঙনের শিকার হয়ে বাঁধসহ উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়া দুই শতাধিক পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।

ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিনুর রহমান বলেন, বাঁধের ভাঙা স্থান দিয়ে নদীর পানি প্রবেশ অব্যাহত আছে। বৃষ্টির মধ্যে বাঁধে আশ্রিত ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। কুটিপাড়া গুচ্ছগ্রামের ৩৯ পরিবারকে এখনো নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি ১ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর—এই পাঁচটি উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নে এক লাখ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছে। এরই মধ্যে সাত হাজার ৬২ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এসব ফসলের  মধ্যে রয়েছে রোপা আমন, বোনা আমন, আগাম জাতের সবজি, আখ, বীজতলা ও বাদাম।

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদ ও ঘাঘট নদীর পানি ধীরগতিতে কমছে। গত শুক্রবার বিকেল থেকে গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৮ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৪২ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

জেলা ত্রাণ দপ্তর জানিয়েছে, জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। ১৯ হাজার ১৫৭টি পরিবারের ৮৫ হাজার ৯৭৫ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় এক হাজার ৩৭৫টি ঘরবাড়ি এবং এক হাজার ১৫৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা নদীর পানি বেড়েই চলেছে। গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় গোয়ালন্দ পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার ৭৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। নদীর পানি বাড়তে থাকায় তীরবর্তী দেবগ্রাম, দৌলতদিয়া, উজানচর ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে পানিবন্দি হয়ে আছে বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার। এদিকে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে গোয়ালন্দ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার নগর রায়েরপাড়া ও দেওয়ানপাড়া মহল্লার একাংশ। পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে রেলওয়ের গোয়ালন্দ বাজার স্টেশন ও দৌলতদিয়া ঘাট স্টেশন রেলপথ।

জেলার রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দের পদ্মা নদীর তীরবর্তী ১৩টি ইউনিয়নের ৬৭ গ্রামের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের প্রায় আট হাজার পরিবারের ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানিসহ গোখাদ্যের সংকট।

কুড়িগ্রামে প্রায় সাড়ে তিন শ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ধরলার পানি বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চারটি উপজেলার ৩৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কিছুটা কমলেও এখনো বিপত্সীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদিপশুর খাদ্যসংকট প্রকট হয়ে উঠছে।

রাজারহাট উপজেলার নামা জয়কুমর গ্রামের বাসিন্দা এনছাফুল হক জানান, ধরলার পানি বাড়ায় অনেক ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। যেটুকু ফসল বাঁচার আশা ছিল তা-ও শেষ হয়ে গেছে। উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, প্রথম দফায় ৬০০ মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও আরো প্রায় দুই হাজার পরিবারকে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া দরকার।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]



সাতদিনের সেরা