kalerkantho

সোমবার ।  ২৩ মে ২০২২ । ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২১ শাওয়াল ১৪৪৩  

৯ জেলায় ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

দৌলতদিয়ার ৪ নম্বর ফেরিঘাট বন্ধ, লঞ্চঘাটে ভাঙন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কয়েক দিন স্থিতিশীল থাকার পর ৯ জেলায় ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করেছে। গতকাল শুক্রবার আটটি নদীর পানি ১২ স্টেশনে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির স্তর গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় স্থির ছিল। তবে বিপত্সীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন

পদ্মার প্রবল স্রোত ও পানির ঘূর্ণিপাকে গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় ফের ভাঙন দেখা দিয়েছে। আর রাজবাড়ীর সদর, কালুখালী ও পাংশা উপজেলায় পদ্মার পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি মানুষের। গবাদি পশুর খাবার সংকট দেখা দিয়েছে।

বন্যার অবনতি হওয়া জেলাগুলো হলো কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও চাঁদপুর। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল শুক্রবার বলেছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি বাড়ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা (আগামীকাল রবিবার ৯টা) পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে, তবে ২৪ ঘণ্টায় (আজ ৯টা পর্যন্ত) তা বাড়তে পারে। তবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় যমুনা নদী বাহাদুরাবাদ, ফুলছড়ি ও মথুরা পয়েন্টে বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে। ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং বিপত্সীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। গতকাল দুধকুমার নদী পাটেশ্বরী স্টেশনে; ধরলা কুড়িগ্রামে; ব্রহ্মপুত্র চিলমারীতে; যমুনা সারিয়াকান্দি, কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ ও আরিচায়; আত্রাই বাঘাবাড়ীতে; ধলেশ্বরী এলাসিনে; পদ্মা গোয়ালন্দ ও সুরেশ্বরে এবং মেঘনা নদী চাঁদপুর স্টেশনে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

এদিকে গতকালের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়- রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। আগামী তিন দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ সপ্তাহের শেষের দিকে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গতকাল দুপুরে কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার ১৯ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার আট সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। ফলে দেড় শতাধিক চর ও নদীসংলগ্ন গ্রাম এলাকা প্লাবিত রয়েছে। পানিবন্দি অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চরের যোগাযোগব্যবস্থা। ৯টি উপজেলায় প্রায় আট হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত তলিয়ে গেছে। সদর উপজেলার ২০টি গ্রামে বন্যার পানি ঢুকেছে। ৮০ শতাংশ আমন ক্ষেত এখন পানির নিচে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক। হলোখানা ইউনিয়নের রাঙামাটি এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে ১০টি গ্রামের কয়েক শ হেক্টর জমির আমন ক্ষেত তলিয়ে গেছে। চিলমারীতে বাঁধসংলগ্ন পাঁচটি গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নদ-নদীর ভাঙনও তীব্র রূপ নিয়েছে। ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও গঙ্গাধরের ভাঙনে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন এলাকায় আরো দুই শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। রাজারহাট উপজেলার কিং ছিনাই গ্রামের ধরলার ভাঙনে এক সপ্তাহে ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। ধরলা অববাহিকার ৩০টি পয়েন্টে দুধকুমারের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নদীর পানি বাড়তে পারে। ফলে জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। উলিপুরে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাতের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ এবং তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বেড়ে নিচু এলাকার জমি, বসতবাড়িতে ঢুকছে। কয়েক দিনে তিস্তা নদীবেষ্টিত উপজেলার বজরা, থেতরাই ও দলদলিয়া ইউনিয়নে কয়েক শ বসতভিটা, মসজিদ, সড়ক, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ১১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল (বিপত্সীমা-১৩.৩৫ মিটার)। জেলা সদর ছাড়াও কাজিপুর ও বাঘাবাড়ী পয়েন্টে যমুনার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কাজিপুর, চৌহালী, শাহজাদপুর উপজেলার নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে তীব্র ভাঙন চলছে। শতাধিক ঘরবাড়ি, শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। পাঁচটি উপজেলায় হাজার হাজার একর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। সিরাজগঞ্জ সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আবু হানিফ জানান, গতকাল পর্যন্ত জেলায় নিম্নাঞ্চলের দুই হাজার ৭৪৯ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। সিরাজগঞ্জ পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন জানান, সিরাজগঞ্জের সব পয়েন্টেই যমুনার পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি বাড়বে বলে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে।

গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় গতকাল বালুভরা বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন পাউবোর কর্মীরা। দৌলতদিয়া ঘাটে কর্মরত বিআইডাব্লিউটিসির ট্রাফিক অফিসার মো. জামাল হোসেন জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে পদ্মায় প্রবল স্রোত বইছে। স্রোতের মুখে ফেরিগুলো স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। দেড়-দুই কিলোমিটার ভাটিপথ ঘুরে চলাচল করায় ফেরি পারাপারে সময় অনেক বেশি লাগছে। এদিকে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৪ নম্বর পন্টুনের পকেটপথ পানিতে তলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটটি বন্ধ রয়েছে। ঘাটটি চালু করতে মেরামতকাজ করছে বিআইডাব্লিউটিএ।

রাজবাড়ী জেলায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার পরিবার স্বজন ও গবাদি পশু নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছে। বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় চলাচলে সমস্যা ও গবাদি পশুর খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। পদ্মার পানি কমতে থাকায় সদর উপজেলার গোদার বাজারের একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। চরের পানিবন্দিরা অভিযোগ করে, এখনো তারা ত্রাণসামগ্রী পায়নি; কেউ তাদের দেখতে আসেননি। বাড়ির চারদিকে পানি। চুলা ভিজে যাওয়ায় ঠিকমতো রান্নাও করতে পারছে না। বাজার বা কাজের জন্য রাজবাড়ী শহরে যেতে হলে নৌকায় উত্তাল কয়েক কিলোমিটার নদী পাড়ি দিতে হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুল হক জানান, প্রতিটি উপজেলায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা এবং কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী, গোয়ালন্দ ও উলিপুর প্রতিনিধি]



সাতদিনের সেরা