kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ মাঘ ১৪২৮। ২৮ জানুয়ারি ২০২২। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

পদে পদে অনিয়ম মালিকের আছে সেবাসংস্থার অবহেলা

হাসেম ফুডসে অগ্নিকাণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে মালিকপক্ষের পদে পদে অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবাসংস্থাগুলোর অবহেলারও তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাঁরা বলছেন, অন্তত দুটি সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের তদারকিতে গাফিলতির তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়-দায়িত্বও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে হত্যার প্রমাণসংক্রান্ত কোনো কিছু তাঁরা এখনো পাননি।

বিজ্ঞাপন

তথ্য ও আলামত যাচাই-বাছাই শেষে শিগগির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

গত ৮ জুলাই হাসেম ফুড কারখানায় লাগা আগুনে ৫২ জন শ্রমিক-কর্মচারী প্রাণ হারান। মর্মান্তিক এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় দায়ের হত্যা মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, শিশুশ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হলেও কলকারাখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ ছিল না। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগের অবহেলারও তথ্য পাওয়া গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ তারে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয়েছে।

যদিও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার আগেই গত ৩০ জুন হাসেম ফুড কারখানার বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে একটি অনিয়মের মামলা করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। পরে ১৫ জুলাই হাসেম ফুডসের মালিক আবুল হাসেমসহ দুজনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেছে অধিদপ্তর। কিন্তু শিশুদের দিয়ে কাজ করানোসহ দৃশ্যমান অনিময়ে অধিদপ্তরের ভূমিকায় নিয়ে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে সূত্র জানায়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের গাফিলতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। আর ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী কারখানাটিতে কোনো ধরনের অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখেনি মালিকপক্ষ। গত ৫ আগস্ট ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিটি সাতটি এবং জেলা প্রশাসন কমিটি ২০টি সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (তদন্ত কমিটির প্রধান) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ‘মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে আমরা বলিনি। কারণ, আইনগত বিষয়ে সিআইডির আলাদা তদন্ত হচ্ছে। ’ 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের সনদ ছিল না কারখানাটির। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের সার্টিফিকেটের পর অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া হয়নি। মালিকপক্ষ পদে পদে অনিয়ম করেছে।

সূত্র মতে, কাজের সময় কারখানাটিতে অ্যালুমিনিয়ামের বেষ্টনী দিয়ে শ্রমিকদের আটকে রাখা হতো। শ্রম আইন অমান্য করে শিশুদের দিয়ে কাজ করানো হতো। এতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কারাখানাটি পরিদর্শন করেননি বলেই তদন্তকারীদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্বও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ঢাকা ও ময়মনসিংহ) ইমাম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্ত এখনো চলছে। আসামিদের আমরা রিমান্ডে পাইনি। তাঁদের ডেকে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একইভাবে ১০-১২টি তদারকির বা লাইসেন্স দেওয়া কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও আমরা কথা বলছি। যাদের অবহেলা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হবে। ’ তদন্ত এখন তথ্য-উপাত্ত যাচাই পর্যায়ে আছে বলে জানান তিনি।

এর আগে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে ৩৪ মুসল্লির মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও তিতাসের কর্মকর্তাদের অবহেলা পায় সিআইডি। তিতাসের আটজন কর্মী ও মসজিদ কমিটির সদস্যকে গ্রেপ্তারসহ পরবর্তী সময়ে চার্জশিটও দেওয়া হয়।

সূত্র মতে, হাসেম ফুডসের ৫২ শ্রমিকের মৃতদেহের সুরতহাল ও পরবর্তী তদন্তে এই প্রাণহানির ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অবহেলাই সামনে আসছে। পরিকল্পিতভাবে প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে কি না বা হত্যার কোনো প্রমাণ আছে কি না, তা-ও যাচাই করে দেখছেন সিআইডির তদন্তকারীরা।

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষক নূর খান লিটন বলেন, ‘হত্যা মামলা হলেও তদন্তের মাধ্যমে অতীতের ঘটনার মতোই হতে যাচ্ছে। অপরাধ মালিকপক্ষের ইচ্ছা না অনিচ্ছায়, তা কখনোই দেখি না। ’



সাতদিনের সেরা