kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

লকডাউন বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন

শ্রমিক স্বার্থ উপেক্ষিত লাভ শুধু মালিকদের

১০ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। লকডাউনের মধ্যেই রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানা ১ আগস্ট থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে

বাহরাম খান   

৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্রমিক স্বার্থ উপেক্ষিত লাভ শুধু মালিকদের

করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে দেশে চলমান বিধি-নিষেধ বা লকডাউনের সময়সীমা আরো পাঁচ দিন অর্থাৎ ১০ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। লকডাউনের মধ্যেই রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানা ১ আগস্ট থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার থেকে সব ধরনের শিল্প-কারখানা খোলার সিদ্ধান্তও এসেছে। চলবে অভ্যন্তরীণ বিমানও। কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা কিভাবে তাঁদের বাসা থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত করবেন, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই সরকারের তরফে। ফলে লকডাউনের মধ্যে বাড়ি থেকে ঢাকায় এসে কাজে যোগ দেওয়া এবং ঢাকায় চলাফেরার বিষয়ে শ্রমিক স্বার্থের বিষয়টি আগের মতো উপেক্ষিতই থাকছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব রেজাউল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, আগের সব বিধি-নিষেধের অনুবৃত্তিক্রমে দুটি শর্ত যুক্ত করে ৫ আগস্ট মধ্যরাত থেকে ১০ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত বিধি-নিষেধের সময়সীমা বর্ধিত করা হলো। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা শর্ত দুটি হচ্ছে, শিল্প-কলকারখানা এই বিধি-নিষেধের আওতায় পড়বে না। আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল করবে।

গত ২৩ জুলাই থেকে চলা লকডাউনে প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হচ্ছে। ঈদের আগে ও ঈদের পর শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে কলকারখানা খুলে দেওয়ার চাপ অব্যাহত ছিল। শিল্প মালিকদের দাবির বিষয়টি মূল্যায়ন করতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে গত ২৭ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। সেই বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন, চলমান লকডাউন চলবেই। শিল্প মালিকরা যে দাবি করেছিলেন, তা গ্রহণ করতে পারছি না। অর্থাৎ ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত কলকারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে সেদিন পর্যন্ত অনড় ছিল সরকার। দুই দিন বাদেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। ৩০ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, রপ্তানিমুখী সব শিল্প-কলকারখানা ১ আগস্ট থেকে লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে। তখন ঈদের ছুটিতে যাওয়া শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে যেভাবে পেরেছেন ঢাকার দিকে ছুটতে থাকেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় পথে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে শ্রমিকদের। ওই সময় এক দিনের জন্য মৌখিকভাবে গণপরিবহন খুলে দিয়ে শ্রমিকদের ঢাকায় আসার বিষয়ে নমনীয় হয় সরকার। কিন্তু ঢাকায় এসে তাঁরা নিজ নিজ বাসা থেকে কর্মক্ষেত্রে কিভাবে যাতায়াত করবেন, তার সমাধান মেলেনি। গতকাল জারি করা প্রজ্ঞাপনে রপ্তানিমুখী কারখানার সঙ্গে দেশীয় শিল্পে নিয়োজিত সব কারখানাও আজ খুলে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। এবারও শ্রমিকরা কিভাবে কর্মস্থলে যাতায়াত করবেন, সে বিষয়ে নির্দেশনা আসেনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের এসব সিদ্ধান্তের কারণে লাভবান হচ্ছেন মূলত ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকরা। বিপরীতে পাল্লা দিয়ে ভারী হচ্ছে শ্রমিকদের ভোগান্তি। বেশির ভাগ শ্রমিককে হেঁটে বা বেশি টাকা খরচ করে কর্মস্থলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সব ধরনের কারাখানা খুলে দেওয়ার কারণে এসব কারখানার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিসও খুলতে হচ্ছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ভোগান্তির মধ্যে অফিস করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যেমন কোনো নির্দেশনা নেই, তেমনি শিল্প মালিকদেরও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

শিল্প-কলকারখানার লিংকেজ কাজের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাসেল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মালিকদের চলার জন্য ছোট গাড়ি সব সময়ই চলে। এখন তাঁরা যেন বিমানে চলতে পারেন, সে জন্য উড়োজাহাজও খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গরিব শ্রমিক আর আমাদের মতো অফিসকর্মীরা কিভাবে চলাচল করবেন সেই চিন্তা সরকার করে না। কারণ সরকারের চিন্তা শুধু বড়লোকদের জন্য।’

এদিকে লকডাউনের বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক বৈঠক সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৭ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে হওয়া বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমন্ত্রিত ছিলেন। গত ৩ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে হওয়া উচ্চ পর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে ১২ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা আমন্ত্রিত ছিলেন। এতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু দুটি বৈঠকের কোনোটিতেই শ্রম প্রতিমন্ত্রী, শ্রমসচিব বা শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আমন্ত্রিত ছিলেন না।

জানতে চাইলে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গৌতম কুমার বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আমাদের প্রতি ছিল না।’ নিজেরা উদ্যোগী হতে বাধা কোথায়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ শ্রমিকের পরিবহন অনেক বড় বিষয়। কিছু প্রতিষ্ঠান হয়তো তাদের শ্রমিকদের পরিবহন দিচ্ছে, সব শ্রমিককে পরিবহন দেওয়াও তো আসলে সম্ভব নয়। করোনাকালে এ বিষয়টি এভাবেই চলছে।’

শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সাকিউন নাহার বেগম গতকাল বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয় নিজে থেকে শ্রমিকদের সরাসরি কোনো স্বার্থ দেখতে পারে না। মালিকপক্ষের মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে কাজ করে। এ বিষয়টিও শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’



সাতদিনের সেরা