kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট

ঢাকা ফেরার যুদ্ধে শিকায় স্বাস্থ্যবিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিল্প-কারখানা খুলে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে গতকাল রবিবারও পথে-ঘাটে ছিল কর্মস্থলমুখী মানুষের স্রোত। শ্রমিকদের যাতায়াতের সুবিধা দিতে ১৬ ঘণ্টার জন্য গণপরিবহন চলাচলে শিথিলতায় ভোগান্তি কিছু কমলেও যাত্রী ছিল উপচে পড়া। এ সময় যাত্রীদের সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। গতকাল দুপুরের দিকে কিছু সময়ের জন্য লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হলে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথের ফেরিতে মানুষের চাপ বেড়ে যায়। পরে সন্ধ্যা পর্যন্ত লঞ্চ চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দিনভর ছিল থেমে থেমে যানজট। একই পরিস্থিতি ছিল বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কেও। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা মোড়েও গাড়িজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে ভোগান্তিতে পড়ে কর্মস্থলমুখী যাত্রীরা।

মালবাহী ট্রাকে ঢেকেঢুকে ঢাকা : শনিবার রাত সাড়ে ১০টা। বগুড়া শহরের সাতমাথা দিয়ে পার হচ্ছে একের পর এক ট্রাক। ছোট, মাঝারি, বড় সব ধরনের ট্রাক। তবে ট্রাকগুলো মালবাহী নয়। দূর থেকে দেখে মালবাহী মনে হলেও সেগুলো মালবাহীর মতো ত্রিপল দিয়ে ঢাকা মাঝখানে খোলা। উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম থেকে ট্রাক আসছে। তাতে আসছে মানুষ। গন্তব্য ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ। নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের পরিবার নিয়ে রওনা হয়েছে ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।

বগুড়া শহরের সাতমাথায় ঢাকাগামী বাস কাউন্টারগুলোর সামনে ব্যাপক ভিড়। ঢাকায় যেতে ভিড় করছে যাত্রীরা। তবে যাত্রীর চেয়ে বাসের সিট নেই বলে জানাচ্ছেন বাস কাউন্টারে থাকা টিকিট বিক্রেতারা। যা-ও দু-একটা টিকিট মিলছে তার দামও তিন গুণ বেশি। বগুড়ার গাবতলীর সুখানপুকুর এলাকার রমজান, রাসেল, সিয়াম, ফকিরুল, রাশেদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, ঢাকা যাচ্ছেন। নামবেন সাভার ইপিজেড এলাকায়। আরকে ট্রাভেলস থেকে টিকিট কিনেছেন। তাঁদের বেশির ভাগই পোশাককর্মী। প্রতিটি টিকিট কিনতে হয়েছে ৩৫০ টাকার স্থলে ৭০০ টাকা করে। কিন্তু কোনো স্বাস্থ্যবিধি নেই। প্রতি সিটেই যাত্রী বসবে।

আরকে ট্রাভেলসের কাউন্টারকর্মী পাপ্পু জানান, প্রতিটি টিকিট ৬০০ টাকা বিক্রি হয়েছে। কিন্তু বাইরে ৭০০ টাকা করে কেন বলছে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্যান্য কাউন্টারেও একই অবস্থা।

গার্মেন্টকর্মী রমজান ও রাসেল জানান, বাসে সিটে তা-ও বসে যাওয়া যাবে। ঈদের দুই দিন আগে বাড়ি আসতে হয়েছে ট্রাকের পাটাতনে বসে। পশুবাহী ফিরতি ট্রাকে। তখনো ভাড়া দিতে হয়েছে ৫০০ টাকা করে।

শনিবার রাত পৌনে ১২টায় বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে বনানী বাসস্ট্যান্ড এলাকা। যানজটে আটকে আছে শতাধিক বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল। যানজটে দেখা মিলল রাজধানী ঢাকার বেশ কিছু লোকাল বাসের সারি। অনাবিল পরিবহন, নবীনগর এক্সপ্রেস, সাভার পরিবহন, ভিআইপি সিটিং সার্ভিসের গাড়িগুলো।

এদিকে বগুড়ার বনানী এলাকায় দেখা যায়, বেশ কিছু প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসে যাত্রী তুলে রওনা দিচ্ছে রাজধানীর দিকে। এই গাড়িগুলোতে যাত্রীপ্রতি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবেই রাজধানী ঢাকায় কর্মে ফিরে যাচ্ছে বিভিন্ন জেলার নিম্ন আয়ের মানুষ।

হাইওয়ে পুলিশের শেরপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ বানিউল আনাম জানান, রাত থেকে যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ ছিল মহাসড়কে। প্রায় সারা রাতই তাঁদের সজাগ থাকতে হয়েছে। রবিবার সকাল থেকে চাপ অনেকটা কমে গেছে। এখন মহাসড়কে ট্রাক দেখা যাচ্ছে বেশি।

লঞ্চে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী : শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাবাজার থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি লঞ্চ ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী নিয়ে শিমুলিয়ায় এসেছে। ঘাট এলাকায় মানুষের চাপে স্বাস্থ্যবিধি উবে যায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে ওঠেন যাত্রীরা। বাসের টিকিট কাউন্টারেও ঢাকামুখী যাত্রীদের ভিড় ছিল। দুপুর ১২টার দিকে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের দায়ে চারটি লঞ্চকে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

শরীয়তপুর থেকে ঢাকাগামী যাত্রী ফয়সাল বলেন, ‘লঞ্চে মানুষের অনেক ভিড়, তাই ফেরিতে করে পদ্মা পাড়ি দিলাম। গতকাল যেতে পারিনি, তাই আজ যাচ্ছি।’

ঘাটে থাকা নারায়ণগঞ্জগামী যাত্রী আসিম দাস বলেন, ‘আমাদের অফিস খোলা। আজ যেতে না পারলে চাকরিই থাকবে না। অফিস থেকে বারবার কল দিচ্ছে। দুপুরের মধ্যে থাকতে হবে।’

পদ্মা পাড়ি দেওয়া দেলোয়ার নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘লঞ্চে ৩৫ টাকার ভাড়া ৫৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তা-ও দু-তিন গুণ বেশি যাত্রী। রিস্ক নিয়ে নদী পার হলাম।’

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বিপ্লব রায়হান বলেন, ‘আমি ঢাকার উত্তরায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। অফিসের কর্মকর্তাদের কল পেয়ে আমি কাজে যোগ দিতে ঢাকা যাচ্ছি। ঘাটে এসে দেখছি ফেরিতে প্রচণ্ড ভিড়।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডাব্লিউটিসি) শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক মাহবুব রহমান বলেন, ‘নৌপথে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে ১০টি ফেরি ও ৮৬টি লঞ্চ সচল রয়েছে।’

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দিনভর থেমে থেমে যানজট : গতকাল সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুরের গোড়াই শিল্পাঞ্চল এলাকায় দিনভর ছিল থেমে থেমে যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় কর্মস্থলে ফেরা মানুষকে। গত শনিবার রাত থেকে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বাড়তে থাকে। ফোর লেনের গাড়ি গোড়াই এলাকায় এসে এক লেনে চলাচল করে। এ কারণে গোড়াই এলাকায় উভয় পাশে কমপক্ষে চার কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয় বলে গোড়াই হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে। এদিকে ওই মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড় থেকে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় শনিবার রাত থেকেই থেমে থেমে যানজট দেখা দেয়।

বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কেও একই পরিস্থিতি : সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ায় সেতুর পশ্চিমের মুলিবাড়ী থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার মহাসড়কজুড়ে ধীরগতিতে চলছে যানবাহন। এ সময় কর্মস্থলে ফেরা শ্রমজীবীদের বহনকারী যানবাহনের চাপে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত দিয়ে চার দফা এবং পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে তিন দফা যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে প্রায় ৪৫ হাজার যানবাহন চলাচল করেছে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা।)