kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

কোথাও অবনতি কোথাও উন্নতি

বন্যা পরিস্থিতি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোথাও অবনতি কোথাও উন্নতি

দুই দিনের ভারি বৃষ্টিতে যশোরের কেশবপুরে ৮০০ মাছের ঘের ভেসে গেছে। পানি ঢুকে পড়েছে অনেক বাড়িতে ও ফসলের ক্ষেতে। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার হাসাইল এলাকাসংলগ্ন পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতে হঠাৎ ভাঙন দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়ায় ভয়াবহ বন্যার কিছুটা উন্নতি হলেও পেকুয়া উপজেলায় অবনতি হয়েছে। তবে স্বস্তির খবর এসেছে বান্দরবান থেকে। গত বুধবার বিকেল থেকে উজানে ও অন্যান্য এলাকায় বৃষ্টিপাত থেমে যাওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হয়ে জনজীবন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেয়েছে।

চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকার ইউনিয়নগুলো থেকে পানি নামতে শুরু করলেও উপকূলীয় সাতটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল বানের পানিতে তলিয়ে রয়েছে। নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে পাশের উপজেলা পেকুয়ায়। এখানে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে মাতামুহুরী নদীতীরের বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপকভাবে ঢলের পানি প্রবেশ করে, যা গতকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। 

পাউবো কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় চকরিয়ার বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধের বিশাল অংশ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে পানির প্রবল চাপে পৌর শহরের মাতামুহুরী নদীতীরের এক নম্বর গাইড বাঁধটির কোচপাড়া পয়েন্টে ধসে পড়ার উপক্রম হলে তাৎক্ষণিক বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তা রোধ করা হয়। লণ্ডভণ্ড হওয়া এলাকা থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর বেড়িবাঁধগুলো সংস্কারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

চকরিয়ার ইউএনও সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা উপদ্রুত এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে শুকনা খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’

কেশবপুরে ভায়না বিলসংলগ্ন স্লুইস গেট দিয়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার মুষলধারে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মাছের ঘের ডুবে যায় এবং বাড়ি-ক্ষেতে পানি ঢুকে পড়ে। উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সজীব সাহা বলেন, পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে ভায়না বিলসহ তত্সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৮০০ মাছের ঘের ভেসে ও অবকাঠামো নষ্ট হয়ে চাষিদের প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভায়না বিলে মাছ চাষি আগরহাটি গ্রামের লিয়াকত আলী বলেন, তাঁর পাঁচ বিঘা জমির মাছের ঘের ভেসে গেছে। উপজেলার চুয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁর শিম, বরবটি, শসা, ঢেঁড়স, লাউসহ অন্যান্য সবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো হয়েছে। বাড়ির উঠানে পানি ঢুকেছে। একই গ্রামের বাসিন্দা সোহেল পারভেজ বলেন, গ্রামের বিশ্বাসপাড়া ও জোয়ার্দারপাড়ার ৩০-৩৫টি বাড়ির উঠানে পানি উঠেছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, পানি নেমে গেলে সবজির ক্ষতির আশঙ্কা খুবই কম।

গৌরিঘোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম হাবিবুর রহমান বলেন, ভায়না বিলের পার্শ্ববর্তী স্লুইস গেট পর্যন্ত পলি ভরাট হওয়ায় সুষ্ঠুভাবে পানি নিষ্কাশিত হতে না পেরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দ্রুত পলি অপসারণের দাবি করেছেন কর্তৃপক্ষের কাছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্সি আছাদুল্লাহ বলেন, ভায়না স্লুইস গেটের পলি অপসারণের জন্য প্রাক্কলন তৈরি করে পাঠানো হয়েছে।

‘ঘরের মধ্যে ছিলাম। হঠাৎ ভাতিজা আইসা বলে, চাচি নদী ভাঙতাছে। যদি তখন না বাইর হইতাম মা-মেয়ে ঘরের লগে সবাই পদ্মায় তলাই যাইতাম। হয়তো রাক্ষুসে পদ্মা ঘুমের ঘোরেই আমাদের গিলে খেত।’ কথাগুলো বললেন গতকাল শুক্রবার মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলায় নদীভাঙনের শিকার এক নারী।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার হাসাইল এলাকাসংলগ্ন পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতে হঠাৎ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গতকাল সকাল ১১টার দিকে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার হাসাইল এলাকাসংলগ্ন পদ্মা নদীতে ভাঙন শুরু হলে কয়েক শ মিটার এলাকার জমি ও আটটি বসতঘর বিলীন হয়ে যায়। ভাঙনের প্রবণতা এতই বেশি যে কোনো রকম ঘর থেকে বের হয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছে লোকজন। এখন হুমকিতে রয়েছে শত শত পরিবারের বসতভিটা, মসজিদ, কবরস্থান, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নানা স্থাপনা। স্থানীয় আলম শেখের তিনটি, জিয়াসমিন বেগমের একটি, খোরশেদের দুটি ও নুর মোহাম্মদ দেওয়ানের দুটি ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। জিয়াসমিন বলেন, ‘আমি ঢাকায় কাজ করি, স্বামী নেই। চার সন্তান নিয়ে একটি ঘরে থাকি। শুক্রবার ঢাকা থেকে এসেছি গ্রামের বাড়িতে। আজকে নদীর ভাঙনে আমার ঘর বিলীন হয়ে গেছে।’ আলম শেখ জানান, হঠাৎ ভাঙনে তাঁর তিনটি বসতঘর নদীতে তলিয়ে যায়। ঘরের অংশ কোনো রকমে তীরে ওঠাতে পেরেছেন।

হাসাইল বানারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইব্রাহিম ঢালী জানান, দ্রুত ভাঙন রক্ষায় কাজ না করলে এলাকার হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। টঙ্গিবাড়ী ইউএনও নাহিদা পারভীন বলেন, ভাঙনসংলগ্ন এলাকার আশপাশের লোকজন ও বসতঘর সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পাউবোর ঢাকা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা সেখানে লোক পাঠিয়েছি। সরেজমিন পরিদর্শনের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেলে আপৎকালে সেখানে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে এই এলাকাসহ লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী এলাকায় ১০ কিলোমিটারের ওপরে ৪৪৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গত ২৮ জুলাই একনেক বৈঠকে পাস হয়েছে। তাই আগামী শুষ্ক মৌসুমে এই এলাকায় ভাঙনরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হবে।’

বান্দরবানের শঙ্খ নদীর উজানে থানচি পয়েন্টে পানির উচ্চতা প্রায় ২০ ফুটে নেমে গেছে। লামা ও আলীকদমের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরী নদীতেও বিপত্সীমার অনেক নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। বর্ষণ থেমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার রাত থেকেই নিচু এলাকার পানি নেমে গেছে।

জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ জানিয়েছে, বান্দরবান পৌর এলাকা, সদর উপজেলা, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে সামান্য পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলেও গত তিন দিনে জেলার কোথাও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেনি।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে গত চার দিনের অতিবর্ষণ আর ঝোড়ো বাতাসে বরগুনার বেতাগী উপজেলার জীবনযাত্রা থমকে গেছে। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বীজতলা, সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে আছে, পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঝড়ে বুধবার রাত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বিদ্যুৎ সংযোগ এখনো তেমন ঠিক হয়নি। ফলে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায়ই বিচ্ছিন্ন থাকছে। অনেক এলাকার রাস্তাঘাটে পানি জমেছে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান এবং প্রতিনিধি মুন্সীগঞ্জ, চকরিয়া, কেশবপুর ও বেতাগী]