kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

রাজধানীর লকডাউন চিত্র

‘পথে কি শখে নামছি’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘পথে কি শখে নামছি’

দুপুর তখন দেড়টা। আকাশ কালো করে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে রাজধানীর বুকে। জিরো পয়েন্টের চৌরাস্তার এক কোণে রিকশার হুড তুলে পলিথিনে নিজেকে গুটিয়ে বসে ছিলেন জয়নাল মিয়া। মধ্য বয়সী। করোনা, স্বাস্থ্যবিধি, বিধি-নিষেধ কোনো কিছুই তাঁর কাছে মুখ্য না। রিকশা নিয়ে তাঁকে বের হতেই হবে। না হলে দিনশেষে চাল নিয়ে ঘরে ফেরা হবে না।

অন্যদিকে পলাশী কাঁচাবাজারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলেন আনোয়ার হোসেন। তাঁর মাথার ওপরও বৃষ্টি। আকাশের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন কখন থামবে বৃষ্টি। কারণ তাঁকে খুঁজতে হবে মোটরসাইকেলের যাত্রী।

গতকাল বৃহস্পতিবার চলমান বিধি-নিষেধের সপ্তম দিনে কথা হয় এই দুজনের সঙ্গে। জয়নাল মিয়া বলেন, ‘ভাই, শখে কি পথে নামছি! কাজকাম না করলে চলুম কেমনে। ঝড়-বৃষ্টি, করোনা যা-ই থাক, কাজ করতে হবে। রিকশা লইয়া না বের হলে খাওন জুটবো না।’

আর আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি করেই খ্যাপ মারতে হয়। একটা ছোট চাকরি ছিল, করোনায় হারাইছি। সংসার চালানো কষ্টের হয়ে পড়েছে। গত ছয় মাস মোটরসাইকেল চালানোর আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছি। পাশাপাশি চাকরিও খুঁজছি। একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়ে গেলে এই ধকল নিতে হইত না।’

এদিকে করোনার বিধি-নিষেধের মধ্যেই প্রতিদিন রাজধানীর সড়কে যান চলাচল বাড়ছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও রিকশায় কোথাও কোথাও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি। সড়কের মোড়ে মোড়ে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে চলছে জিজ্ঞাসাবাদও। পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাবের টহল দল নিয়মিত শহরজুড়ে তদারক করছে। গ্রেপ্তার, মামলা ও জরিমানা কিছুই থেমে নেই।

গতকাল সকালে আজিমপুর, সায়েন্সল্যাব, কলাবাগান, আসাদগেট, মোহাম্মদপুর ও জিগাতলা ঘুরে দেখা গেছে, আগের দিনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করছে। বিভিন্ন চেকপোস্টে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হচ্ছেন চলাচলকারীরা। তবে দুপুরে বৃষ্টির মধ্যে শান্তিনগর, পল্টন, বাড্ডা, রামপুরা এলাকায় পুলিশের তল্লাশিচৌকিগুলো ফাঁকা দেখা যায়। সে সময় ওই সড়কগুলোয় অবাধে গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে।

পুরান ঢাকার লালবাগ, কেল্লার মোড়, বকশীবাজার, নবাবগঞ্জ এলাকার অলিগলিতে অনেক বেশি মানুষ, ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। এসব এলাকায় সকালের বৃষ্টিতেও থেমে ছিল না মানুষের ঘর থেকে বের হওয়া। আজিমপুর চৌরাস্তা ও চানখাঁরপুলে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেলেও ছিল না তৎপরতা। তবে সকালে সিটি কলেজের সামনে বসানো পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা গেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সালাউদ্দিন আহাম্মেদ। সিটি কলেজের মোড়ে পুলিশের তল্লাশি শেষে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই এই পথ ধরে অফিসে যাই। কোনো কোনো দিন মোটরসাইকেল থামিয়ে পুলিশ নানা কথা জিজ্ঞেস করে, আবার কোনো দিন থামায় না। রাস্তায় প্রতিদিন গাড়ি বাড়ছে। আজ (গতকাল) সপ্তাহের শেষ দিন হওয়ায় গাড়ির চাপ অনেক বেশি।’

মূল সড়কে মানুষের চলাচল কিছুটা বাড়লেও পাড়া-মহল্লায় বিপুল হারে বেড়েছে মানুষের চলাচল। বিকেল পর্যন্ত বাজার, মুদি দোকানের অজুহাতে ঘরের বাইরে থাকছে মানুষ। আর সন্ধ্যার পর এলাকার মোড়ে মোড়ে, অলিগলিতে শুরু হয় আড্ডা। বেশির ভাগ দোকান অর্ধেক শাটার বন্ধ করে খোলা রাখা হচ্ছে। আবার রাতের বেলায় আসাদগেট-মোহাম্মদপুর সড়কে লেগুনা চলাচল করতে দেখা গেছে।

হাজারীবাগের কালুনগর এলাকার দোকানি দেলোয়ার বলেন, ‘দুপুর ৩টার পর থেকে মনে হয় করোনা বাইরা যায়। সকালতে কোনো সমস্যা নাই। কী একটা অবস্থা, ৩টা বাজলেই পুলিশ বাঁশি ফুয়াইতে ফুয়াইতে যায়। পরে লুকাইয়া যতক্ষণ পারা যায় দোকান খোলা রাখি।’